রাজশাহীতে ‘ডিম সিন্ডিকেটে’র দৌরাত্ম্যে বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। করপোরেট সিন্ডিকেটের কারণেই ডিমের দাম বেড়েছে বলে পোলট্রি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিষয়টি এখন সবার কাছেই ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়ছে। ফলে শুধু ভোক্তা নয়, স্থানীয় প্রশাসনও অসহায় হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার সাহেববাজারে অভিযান চালিয়ে তিন খুচরা ডিম ব্যবসায়ীকে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তবে কর্তৃপক্ষের এই অভিযান ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর বলে মনে করছেন না ভোক্তারা। ভোক্তারা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আরও কঠোর হতে হবে।
নগরীর শিরোইল এলাকার আবুল কালাম আজাদ জানান, অধিদপ্তরের অভিযান সিন্ডিকেট ভাঙতে কোনো ভূমিকা রাখছে বলে মনে হয় না। কারণ, রবিবারও ৫২ টাকায় এক হালি ডিম কিনতে বাধ্য হয়েছি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম জানান, অভিযানের পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঢাকা অফিস যোগাযোগ করছে। রবিবার তাদের নিয়ে সভা করা হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে তাদের করণীয়টা তারা করছেন।
রাজশাহীর প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, ডিম ও মাংসের দাম এখন আর তারা নির্ধারণ করেন না। সবই এখন করপোরেটের সিন্ডিকেটের দখলে। খামারিরা নামমাত্র লাভ পাচ্ছেন। আর যখন খুশি ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটছে করপোরেট সিন্ডিকেট। করপোরেট সিন্ডিকেটের মূল হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং। পোলট্রি খাতে ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ নামে গড়ে ওঠা চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় খামারিদের বাচ্চা, খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান। মুরগি বিক্রির উপযোগী হলে এবং মুরগি ডিম দিতে শুরু করলে খামারিদের থেকে চুক্তিবদ্ধ মূল্যে কিনে নেয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এরপর তারা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে তা আড়তদারদের সরবরাহ করে। এরপর আড়তদাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। এর ফলে খামারিরা কখনো কখনো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরোক্ষ চাপে ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে একচ্ছত্রভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এই করপোরেট সিন্ডিকেট। এভাবেই করপোরেট কোম্পানিগুলোর নির্ধারিত মূল্যে ভোক্তা মাংস ও ডিম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজশাহী পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, জেলায় ২ হাজারের বেশি ডিমের খামার রয়েছে। এর ৪০ শতাংশের বেশি এখন কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের অধীনে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে, খামারিরা কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। পুঁজি কম থাকায় খামার পরিচালনার জন্য তাদের অগ্রিম অর্থের প্রয়োজন হয়। অন্যথায় খামার বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।
পবা উপজেলার রনিহাটি গ্রামের খামারি শফিকুল ইসলাম জানান, মুরগির খাবার এবং ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে প্রান্তিক অনেক খামারি ডিম উত্পাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।
একই উপজেলার মুরারিপুরের খামারি আরিফ হোসেন জানান, সাত-আট বছর ধরে তিনি ডিমের মুরগি লালনপালন করছিলেন। এ বছরের মাঝামাঝিতে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। সবকিছুই এখন সিন্ডিকেটের দখলে।
রাজশাহী পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক জানান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক তত্পরতা না থাকায় এ অবস্থা। এ অবস্থা চলতে থাকলে ডিমের দাম বছর ঘুরে প্রতি পিস ২০ টাকা হতে সময় লাগবে না। অবিলম্বে এই অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। তা না হলে পোলট্রি শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
রাজশাহী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. জুলফিকার মো. আখতার হোসেন জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা তারা নন। কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা করপোরেটের আগ্রাসন নিয়ে তাদের কিছু করার নেই।