হিমুর হাতে কয়েকটি লাল ডিম্ব

কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির শীতল স্পর্শে ঘুম ভাঙল হিমুর। জানালার হলুদ পর্দাটা টেনে ঘরের ভেতর বৃষ্টি আসা ঠেকাতে চেষ্টা করল সে। হিমু জানে তার এ চেষ্টা মোটেও যথেষ্ট নয়, কারণ  তার ঘরের দরজার মতো জানালারও বেহাল দশা। জানালার উপরের দুটো পাল্লার প্রায় পুরোটাই ঘুণপোকায় খেয়ে গেছে সেই কবে। ধীরে ধীরে বাতাসের তুমুল ঝাপ্টা শুরু হলো, বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা ততক্ষণে বিছানার একটা বড় অংশ ভিজিয়ে ফেলেছে। হিমু উপলব্ধি করল বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া নিরর্থক। বৃষ্টি ঠেকানোর বৃথা চেষ্টা না করে হিমু কাঁথা মুড়ি দিয়ে আবার সটান শুয়ে পড়ল।

হিমুর মেসবাড়িতে টিনের ছাদ, এই ছাদে বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির মিউজিক্যাল শব্দ অল্প সময়েই হিমুকে টেনে নিয়ে গেল ঘুমের রাজ্যে।

হিমুর যখন ঘুম ভাঙল ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে। হিমুর হাতে কিংবা ঘরে কোনো ঘড়ি নেই। সে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের পরিবেশটা দেখে সময় আঁচ করার চেষ্টা করল। শ্রাবণের আকাশ আর সদ্য বৃষ্টি হওয়ায় বোঝবার উপায় নেই এখন ঠিক কয়টা বাজে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে হিমুর প্রথম কাজ হয় সারাদিন কী কী করবে, কোথায় কোথায় যাবে তা ঠিক করা। বিছানায় বসে বসে হিমু সেসবই যখন ভাবছে তখনই ক্ষুধায় পেটটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। বৃষ্টির জন্যই কি না হিমুর হঠাত্ খিচুড়ি খাওয়ার খুব ইচ্ছে হলো। হিমুর কল্পনাশক্তি প্রবল। সে চোখ বন্ধ করতেই দেখতে পেল মাটির একটা থালায় হলদে রঙের নরম খিচুড়ি, সঙ্গে দুটো করে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর একটা ভুনা ডিম।

 

২.
হ্যাঙ্গারে টানানো একমাত্র হলুদ পাঞ্জাবিটা পরেই ঘর থেকে বের হলো হিমু। বৃষ্টি হলে হিমুর অবশ্য হাঁটতে সুবিধে হয়। গ্রীষ্মের দিনের পিচগলা রাস্তায় খালিপায়ে হাঁটার থেকে কর্দমাক্ত আর জলাবদ্ধ রাস্তা ঢের ভালো হিমুর কাছে। রাস্তায় নামতেই ভুনা ডিম-খিচুড়ি বিলাস আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল হিমুর। তার একবার ইচ্ছে হলো রাস্তার পাশের কোনো এক রেস্তোরাঁ থেকে খাবার নিয়ে পার্কে যাওয়ার। পার্কের বেঞ্চে বসে একসঙ্গে ডিম-খিচুড়ি ও বৃষ্টি বিলাস— খুব একটা মন্দ না।

কিন্তু এ ইচ্ছেটা মুহূর্তেই বাদ দিতে হলো হিমুকে। পাঞ্জাবির পকেটে যে কোনো টাকা-পয়সা নেই এটা হিমুর অজানা নয়। হুট করে পকেট থেকে মুঠোফোনটা বের করল সে। মুঠোফোনটা রূপার দেওয়া উপহার। হিমুর আগে পকেট ছিল না। রূপা হিমুকে মুঠোফোনটা উপহার দেওয়ার সময় বলেছিল পাঞ্জাবিতে একটা পকেট জুড়ে দিতে। সেদিন রূপা চোখ ছলছল করে বলেছিল, ‘অন্তত আমার এই অনুরোধটা রেখো।’ কারো অনুরোধে ঢেঁকি গেলার লোক নয় হিমু, তবে রূপার এই অনুরোধটা কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেনি সে। পরদিনই মাজেদা খালার কাছে গিয়ে পাঞ্জাবিতে জুড়ে নিয়েছিল পকেট। মুঠোফোনটার সবচেয়ে প্রিয় নম্বরটায় কল করল হিমু। কয়েকবার রিং বাজতেই ওপাশ থেকে রূপার স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল, ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তুমি ফোন দিয়েছ? সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে?’

হিমু হেসে উত্তর দিল, ‘ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে আজ, সূর্য কোনো দিকেই উঠেনি!’

রূপা আনন্দে গদগদ হয়ে যোগ করল, ‘কিন্তু কোনো কারণ  ছাড়া তো কল দেওয়ার বান্দা তুমি না। কারণটা জানার জন্য তর সইছে না আমার।’

হিমু বলল, ‘আমাকে ডিম ভুনা-খিচুড়ি খাওয়াতে পারবে আজ? খুব ইচ্ছে করছে তোমার সামনে বসে খেতে খেতে বৃষ্টি বিলাস করি।’ হিমুর এমন কথায় টপটপ করে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল রূপার। অবশ্য মুহূর্তেই কান্না সামলে নিয়ে বলল, ‘ফোনটা রাখছি হিমু। এখনি খিচুড়ি চড়াচ্ছি, তুমি আধাঘণ্টার  মধ্যেই চলে আসো।’

কলটা কেটে যাওয়ার পরপরেই কিছুটা মন খারাপ হলো হিমুর। কারণ হিমুর বাবা বলে গিয়েছেন, ‘শোন বাবা, তুই যদি মহাপুরুষ হতে চাস তবে রূপবতী নারীদের সংস্পর্শে কখনোই যাওয়া যাবে না; জাগতিক মোহে জড়িয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।’ হিমু খুব ভালো করেই জানে রূপার ওখানে সে খিচুড়ি খেতে যাবে না কখনোই। অবশ্য হিমুর প্রবল ধারণা রূপা নামের বোকা মেয়েটাও জানে হিমু কখনোই খেতে আসবে না। হিমু কল্পনায় দেখবে— খুব যত্ন করে রূপা রান্না করবে, এরপর হিমু আসবে না জেনেও খাবার টেবিলে সবকিছু সাজিয়ে তার জন্য দিনভর অপেক্ষা করবে।

 

৩.
হিমু হঠাৎ মনস্থির করল মাজেদা খালার বাসায় যাওয়ার। অবশ্য এমন বৃষ্টির দিনে মাজেদা খালার ওখানে যাওয়া নিতান্ত বোকামি হবে এটা তার অজানা নয়। হিমু জানে ‘ওয়েদার ডিমান্ড’ অনুযায়ী খালু সাহেব রঙিন পানির আসর বসিয়ে ফেলেছে এতক্ষণে। এমন সময়ে খালুর সামনে পড়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। এমন আবহাওয়ায় ডিম-খিচুড়ির বদলে খালুর ইংরেজি গালি খাওয়ার কোনো মানেই হয় না। অবশ্য মাজেদা খালাকে ফোন দিয়ে বাসার বর্তমান অবস্থা কী তা জানার ইচ্ছে হলো হিমুর। মুঠোফোনটায় যখন মাজেদা খালার নম্বর খুঁজছে এমন সময়েই একটা ছেলে দৌড়ে এলো তার দিকে। কাছে আসতেই হিমু ছেলেটাকে চিনতে পারল। ছেলেটা হিমুর পূর্ব পরিচিত আন্ডা বাবলু। চলতি গাড়ি থেকে নিমিষেই ডিম ছিনতাই করে বলে সে সবার কাছে আন্ডা বাবলু নামেই পরিচিত। হিমু কিছু বুঝে উঠার আগেই বাবলু একটা খাঁচা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘হিমু ভাইজান, খাঁচাটা একটু লন তো।’

হিমু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের খাঁচা এটা, কী আছে এতে?’

বাবলু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘এত কথা এখুন কইবার পারুম না। আগলাইয়া রাইখেন খাঁচাটা, আমি জানি দুইন্যাই উল্টায়া গেলেও এইটা আফনের কাছেই সেইফ থাকব। সময়-সুযোগ মতো আমার এক চ্যালা আপনের মেসে গিয়া খাঁচাটা লইয়া আইব!’

একনাগাড়ে কথাগুলো বলেই বাবলু চিপা গলির ভেতরে মিলিয়ে গেল। হাতের খাঁচাটার দিকে তাকালো হিমু। খাঁচার উপরটায় আলগা করে খড় দেওয়া। কিছু খড় সরাতেই হিমু ভিমড়ি খেলো। খাঁচায় থরে থরে সাজানো রয়েছে ব্রয়লার মুরগির লাল রঙের ডিম। বর্তমান বাজার এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে তাতে একহালি ডিমের দামে ঢাকায় এককাঠা জমি পাওয়া যায়! হিমু আন্দাজ করল ডিমের দাম বাড়ায় বাবলু হয়ত আবার পুরনো পেশায় নেমেছে। ডিমের খাঁচাটা নিয়ে এখন কী করা যায় তা ভাবতে লাগলো হিমু। কিছুক্ষণ আগেই মেস থেকে বের হয়ে এসেছে সে, এত দ্রুত মেসে ফিরতেও ইচ্ছে করল না তার। নিতান্ত বাধ্য হয়েই সে এক হাতে ডিমের খাঁচা নিয়ে হাঁটতে লাগল ফুটপাত ধরে গন্তব্যহীন।

 

৪. পথে পথে হাঁটতে হাঁটতেই হিমুর সামনে পড়ল একদল টহল পুলিশ। তাদের একজন হাত ইশারায় থামাল হিমুকে। পুলিশের ডাক উপেক্ষা করতে নেই, তাদের দিকে এগিয়ে গেল হিমু। গোটা পাঁচেক পুলিশ গাড়িতে বসা। হিমু আঁচ করতে পারল তাদের মধ্যেই রয়েছে একজন দলনেতা। নেমপ্লেটে লেখা দলনেতার নাম মোরশেদ, তার চাপা ভাঙ্গা মুখ। এই মুখের সঙ্গে যোগ হয়েছে হিটলারের মতো গোঁফ। দূর থেকে যে কেউ তার মুখের দিকে তাকালে ঠোঁটের উপরে একটা মাছি বসে আছে এমনটা ভেবে ভুল করবে। দলনেতা খিটখিটে কণ্ঠে  জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাতে কী?’

হিমু নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে উত্তর দিল, ‘তেমন কিছু না, আপেল!’

ভ্রু কুঁচকে মোরশেদ সাহেব বললেন, ‘আপেল লইয়া যাইতাছ খড় দিয়ে ঢেকে?’

হিমু কিঞ্চিত রসিকতা করে বলল, ‘বৃষ্টির পানি আপেলের উপর পড়লে গায়ে দাগ হয়ে যায়, তাই এমন ব্যবস্থা!’

হিমুর রসিকতায় মন ভরল না মোরশেদ সাহেবের। চোখ ইশারায় কনস্টেবলদের একজনকে নির্দেশ দিলেন, ‘ভেরি সাসপিসাস পার্সন, সার্চ হিম!’

হিমুর শরীর তল্লাশি করার প্রয়োজন পড়ল না, শুরুতে খাঁচা তল্লাশি করতেই সবার দৃষ্টিগোচর হলো ডিমের। একসঙ্গে এতগুলো ডিম দেখে চোখ চকচক করে উঠল পুলিশ কর্মকর্তার। মাছিগোঁফের মাঝখানটা চুলকাতে চুলকাতে মোরশেদ সাহেব বললেন, ‘ও আই সি! ডিমের যে চোরাচালানটা হচ্ছিল তার পালের গোঁদা তাইলে তুমিই? ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।’

হিমু অতীত অভিজ্ঞতায় জানে এ মুহূর্তে পুলিশকে শতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে হবে। সুতরাং নিরর্থক চেষ্টা না করে মাছিগোঁফওয়ালা পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশমতো উঠে বসল পুলিশের গাড়িতে। থানায় ঢুকেই হিমুকে নেওয়া হলো লম্বা শিকে ঘেরা ঘরটায়। এ ঘরটা হিমুর বেশ পরিচিত। এ ঘরে সন্দেহজনক লোকজনকে এনে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ  আর হালকা থেরাপি দেওয়া হয়। এর আগেও হিমু কয়েকবার এ ঘরে এসেছে। হিমু ঘরে ঢুকতেই দেখল ঘরের এক কোনায় আন্ডা বাবলু শুয়ে আছে। বাবলুকে দেখেই হিমুর বুঝতে বাকি রইল না আচ্ছা করে ইতিমধ্যেই থেরাপি হয়েছে তাকে।

হিমুর ডাকে ধীরে ধীরে চোখ খুলল বাবলু। তাকে দেখেই সে ব্যথাতুর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘হিমু ভাইজান আফনে এখানে। ডিমসহ ধরা খাইছেন?’

হিমু রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ? কিন্তু তুমি ধরা পড়লা কীভাবে?’

বাবলু কাঁদো কাঁদে স্বরে বলল, ‘আফনের হাতে খাঁচাটা দিয়ে দৌড় দেওনের পরপরই পুলিশের হাতে ধরা খাইছি। শুয়োরের বাচ্চারা বেদম মারসে ভাইজান। অবস্থা ভালো না, আফনেরেও মারব!’

হাসল হিমু। বলল, ‘তা মারুক। কিন্তু তুমি না এসব কাজ ছেড়ে দিয়েছিলে, আবার ডিম চোরাচালান শুরু করসো নাকি?’

কানে আঙুল ঠেকিয়ে বাবলু বলল, ‘না ভাইজান, আফনের কাছে প্রতিজ্ঞা করেই তো ভালো হয়ে গেছি সেই কবে। আসলে সকালে শুনতে পেলাম আমগো মহল্লার এতিমখানার শিশুরা এই বৃষ্টির দিনে ডিম আর খিচুড়ি খাইতে চাইছিল। বৃষ্টি দেখে আমারো ইচ্ছে হইছিল তাগো লগে ডিম-খিচুড়ি খাই। বাজারে ডিমের দাম চড়া, এক সাথে এতগুলো ডিমও পাওয়া যায় না। এরজন্যই পূর্বপরিচিত এক ডিলারের সাথে যোগাযোগ করে এক খাঁচা ডিমের ব্যবস্থা করছিলাম। কিন্তু পুলিশ ব্যাটারা এসব চোরাচালানের ডিম ভাইবা আমারে টার্গেট করছিল। আমারে ধরবার পারে এমন সংবাদ পাইয়াই আপনেরে খাঁচা দিয়া দিছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষে হইল না, আফনেও আমার লাইগা পড়লেন বিপদে।’

হিমু বলল, ‘আমার জন্য আফসোস করো না বাবলু!’

বাবুল যোগ করল, ‘ভাইজান আফসোস হইতাছে ওই পোলাপাইনরার লাইগা। বৃষ্টির দিনটায় তাগো ইচ্ছেটা পূরণ  করবার পারলাম না!’

 

৫.
বাবলুর সঙ্গে হিমুর আলাপের সময়েই হনহন করে থানায় ঢুকল থানার বড়কর্তা। মাছিগোঁফওয়ালা মোরশেদ সাহেবকে ডেকে বললেন, ‘কোথায় ডিম-সন্ত্রাসীরা, ওদের টেবিলের সামনে নিয়ে আসো!’

দাঁত বের করে মোরশেদ সাহেব বললেন, ‘দুজনরে ধরসি স্যার। তাদের একজনকে অলরেডি ডিম থেরাপি দেওয়া শেষ, সব স্বীকার করে ফেলেছে। আরেকজনকে থেরাপি দেওয়া শুরু করব আপনার অর্ডার পাইলেই।’

বড়কর্তা গম্ভীরমুখে বললেন, ‘কথা কম বলেন। আগে নিয়ে আসেন তাদের। আমি কথা বলে দেখি।’

বড়কর্তার এমন নিরুত্তাপ হাবভাব মোটেও পছন্দ হলো না মোরশেদ সাহেবের। সে ভেবেছিল এত বড় বড় দুজন শীর্ষ ডিম-সন্ত্রাসী ধরায় বড়কর্তা নিশ্চিত উচ্ছ্বসিত হয়ে উপর মহলে রিকমেন্ড করবে তার প্রমোশনের জন্য। নির্দেশমত বাবলু আর হিমুকে নিয়ে আসা হলো বড়কর্তার টেবিলের সামনে। টেবিলে রাখা ডায়েরিটায় কিছু একটা লিখছিলেন বড়কর্তা, লেখা শেষে মুখ তুলে তাকালেন হিমুর দিকে। হিমুর চোখে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলেন বড়কর্তা। মুহূর্তেই চেয়ার থেকে সটান দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরে হিমু ভাই, আপনি?’

হিমু কিছু না বলে তার দিকে চেয়ে হাসল। বড়কর্তা মোরশেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রীতিমতো তিরস্কার করে বললেন, ‘একটা ভালো কাজ কখনো করতে দেখলাম না আপনাকে, উল্টো সবসময় অঘটন ঘটান! দুনিয়াতে আর কাউকে পাইলেন না, ধরে নিয়া আসছেন হিমু ভাইরে!’

কোনোকিছু বুঝে উঠলেন না মোরশেদ সাহেব। ভয়ার্ত চোখে বললেন, ‘কিন্তু স্যার, উনি তো ডিমসহই ধরা পড়েছেন!’

বড়কর্তা চোখ গোলগোল করে বললেন, ‘হিমু ভাইরে চেনো তুমি? উনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতাওয়ালা মানুষ, দরবেশ মানুষ। কথা না বাড়িয়ে যেখান থেকে হিমু ভাইরে তুলে এনেছ সেখানে গাড়িতে করে রেখো আসো, নইলে দেখবা প্যান্ট ভিজে যাওয়ার দশা হইছে!’

মাছিগোঁফের মোরশেদ সাহেব পুলিশের বড়কর্তার কথায় সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো না। তিনি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলেন। বড়কর্তা হিমুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওনারে মাফ করে দেন হিমু ভাই, আপনারে চেনে না। এ থানায় নতুন এসেছে।’

হিমুর ঠোঁটে রহস্যময় এক হাসি। পুলিশের বড়কর্তা এ হাসির মর্মার্থ ধরতে পারলেন বলে মনে হলো না। তিনি যোগ করলেন, ‘হিমু ভাই, কী খাবেন বলেন। চা, সিগারেট? সিঙ্গারা আনাই?’

হিমু বাবলুর দিকে তাকিয়ে বড়কর্তাকে বলল, ‘আজ কিছুই খাব না স্যার। অবশ্য কোনো সমস্যা না থাকলে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া ডিমের খাঁচাটা ফিরিয়ে দিলে খুব উপকার হতো। আজ আমাদের ইচ্ছে করছে ডিম দিয়ে খিচুড়ি খেতে।’

বড়কর্তা খুশি হয়ে বললেন, ‘বসেন তাইলে দু মিনিট, আনিয়ে নিই!’

হিমু বলল, ‘না স্যার। আজ খিচুড়ি রান্না হবে বাবলুর বাসায়। বাবলুর বউ শেহেরজান ভাবি চমত্কার ডিম-খিচুড়ি রান্না করেন। মনস্থির করেছি আজ ওখানেই খাব।’

বড়কর্তা চোখ ইশারা করলেন মোরশেদ সাহেবের দিকে। এই ইশারার অর্থ তিনি ভালোমতোই বোঝেন, নির্দেশমতো ডিমের খাঁচাটা টেবিলে এনে রাখলেন। বড়কর্তা গাড়িতে করে রেখে আসার অনুরোধ করলেন, কিন্তু হিমু সবিনয়ে সে অনুরোধ ফিরিয়ে দিল। বড়কর্তার কাছে বিদায় নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে এলো হিমু আর বাবলু। হিমুর হাতে ডিমের খাঁচা, তার পিছু পিছু হাঁটছে বাবলু। আবার শহরতলীতে ঝুম বৃষ্টি নামল। বাবলু হিমুর হাত টেনে ধরে বলল, ‘বৃষ্টিতে তো ভিজে যাবেন হিমু ভাইজান। চলেন বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত ওই চায়ের দোকানটায় অপেক্ষা করি।’ হিমু আলতো করে বাবলুর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘বৃষ্টি হোক বাবলু। বৃষ্টিতে ভিজলে পাপ কাটা যায়!’ বাবলু দ্বিমত করল না, সে জানে হিমু ভাই যা বলেছে তা মিথ্যে হতেই পারে না। বাবলুর হঠাৎ উপলব্ধি হলো— সে অত্যন্ত পাপী একজন মানুষ। সে সিদ্ধান্ত নিল এখন থেকে যখনই বৃষ্টি হবে, সে বৃষ্টিতে গা ভেজাবে, কিছু পাপ ধুয়ে যাওয়া দরকার।

হিমু বলল, ‘বাবলু গান জানো?’

বাবলু বলল, ‘জানি, ভাইজান’ বলে বাবলু ভাঙাগলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে গাইতে লাগল, ‘ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়। বৃষ্টির দিনে ডিম-খিচুড়ি খাইতে খাইতে যেন আমার মরণ হয়!’