শংকরে নিজেদের বাড়িতে বাস করতো মেয়েটি, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তেজগাওঁ কলেজে পড়াশুনা করতো। সেই কলেজেই একটি ছেলের সঙ্গে তার প্রেম হয়। ২০২১ সালে তারা বিয়ে করে। তখন দুজনেরই বয়সই ১৮ বছরের নিচে। পরিবারের কেউ তাদের বিয়েতে রাজি ছিল না। তারা নিজেরাই বিয়ে করে। কিছুদিন পর ছেলের বাড়িতে আসে। মেয়েটি এক বছরের মধ্যে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। এরপর আর পড়াশুনা হয়নি তার। ছেলেটি এখন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। বাড়ি থেকে তার হাত খরচের টাকা দিলেও তার বাচ্চার জন্য কোনো খরচ দেয় না। মেয়েটি এক দিন ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্স অফিসে আসে অফিস সহকারীর চাকরির জন্য।
প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানার তার পরিবারকে চেনেন। তিনি মেয়েটিকে বলেন, তুমি আবার পড়াশুনা করো, তোমাকে আমি এই চাকরি দিতে পারবো না। রোকসানা সুলতানা ইত্তেফাককে বলেন, আজ-কাল সমাজে বাল্যবিবাহের একটি করুণ রূপ দেখা যায়। যেখানে ছেলে-মেয়েরা প্রেমের সম্পর্ক জড়িয়ে ১৮ বছরের আগে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবার আপত্তি করলে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ আবার বিয়ে না দিলে আত্মহত্যা করে কিংবা করার হুমকি দেয়। শহর-গ্রাম, ধনী-গরীব সবক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে বলে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত হেল্প লাইনে খোঁজ করে জানা যায়। এমন বিয়ে কিংবা বাড়ি থেকে পালিয়ে পাওয়ার ঘটনা সপ্তাহে ২/৩ টি ঘটে থাকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনা ও তার পরবর্তী সময় যেমন পরিবার দারিদ্র ও নিরাপত্তারহীনতার কারণে বাল্যবিয়ের হার বাড়ে, তেমন একটা বড় অংশ কিশোর-কিশোরীরা নিজেরাই ১৮ বছর হওয়ার আগে বিয়ে করছে। করোনাকালে শিক্ষার্থীদের হাতে মোবাইল ফোন চলে যাওয়ায়, তারা পড়াশোনার পাশাপাশি নানা রকম পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হওয়া, নিজেদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করা, ফেসবুকের মাধ্যমে প্রেমে প্রতারণার শিকার হওয়ার মতো কারণগুলো উল্লেখ করেন। এর ফলে পরিবারে অশান্তি শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়া, অল্প বয়সে মা হওয়ার জন্য শারীরিক নানারকম জটিলতা দেখা দেয়। অনেকেই নিজেকে এককেন্দ্রিক করে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয় বলে জানান মনো সাইকোকান্সিলররা। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ ‘বিনিয়োগে অগ্রাধিকার কন্যা শিশুর অধিকার’ প্রতিপাদ্য করে পালিত হচ্ছে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস।
হেল্প লাইনে আসছে ফোন
গত ২৪ আগস্ট সমাজসেবা অধিদপ্তরে গিয়ে জানা যায়, ১০৯৮ নম্বরে প্রতি সপ্তাহে নিজেরা ইচ্ছে করে বাল্যবিবাহ দেওয়ার ফোন কল আসে ২-৩টি। সেদিনই বরিশাল থেকে এমন একটি ফোন আসে। যে ফোন কলে ১৬ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়ুয়া মেয়েকে তার ছেলে বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে ঢাকায় আসার কথা জানান বাবা।
১০৯৮-এর পক্ষ থেকে জানা যায়, ফেসবুকের মাধ্যমে ঢাকায় থাকা একই বয়সের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক হয়। ছেলেটি বেশ কয়েকবার মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে বরিশালে যায়। মেয়েটি এক সময় গর্ভবতী হয়ে পড়লে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় ছেলেটির কাছে চলে আসে।
১০৯৮- এর পরামর্শক মো. তবিউর রহমান বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ছেলে-মেয়েরা বিয়ে না দিলে পরিবারকে আত্মহত্যা করবে বলে ব্ল্যাকমেইল করে। অনেক সময় তারা আত্মহত্যাও করে।
১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহাইমেন বলেন, করোনাকালে পড়াশোনার জন্য মোবাইল ফোন শিশুদের হাতে চলে আসে। সে সময় পড়ালেখার পাশাপাশি শিশুরা নানারকম পর্ণগ্রাফিতে আসক্ত হয়। একটি মেয়ে তার নিজের পাসওয়ার্ড তার বন্ধুকে দেয়, এই সুযোগে ছেলেটি আপত্তিকর ছবি আপলোড করে এমন ঘটনাও ঘটছে। আর এই ছেলেমেয়েদের বোঝানোর ক্ষমতা অনেক সময় অভিভাবকরা রাখেন না।
১০৯৮ এর তথ্য মতে, বছরে ১৪০-১৪২টি নিজেরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। ২০২৩ সালের ছয় মাসে ৩৬টি নিজেরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে বিষয়ে কল আসে ১০৯৮-এ।
চৌধুরী মোইমেন বলেন, প্রকৃত ঘটনা আরও অনেক বেশি। সব ঘটনার ফোন আমাদের কাছে আসে না।
একই কথা বলেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত ১০৯ হেল্প লাইন ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম। প্রতিমাসে ১০০ থেকে ১৩০ এর মতো বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত ফোনকল আসে, এর মধ্যে ১০ থেকে ১২ শতাংশ নিজেরা পালিয়ে বিয়ে কিংবা বাবা-মকে চাপ দিয়ে বিয়ের ফোন আসে।
বিয়ে না দিলে আত্মহত্যা
চৌধুরী মোহাইমেন বলেন, এমন বিয়েগুলো দিতে বাবা-মা অনেক সময় বাধ্য হন। কারণ, তারা বিয়ে না দিলে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। আবার যখন শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, গর্ভবতী হয় তখন মেয়ে ও তার পরিবার ভাবে ওই ছেলের সঙ্গে বিয়ে ছাড়া কোনো পথ নেই। তাদের কাছে এই কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকারও ফোন কল আসে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, এক গবেষণায় দেখা যায় কিশোর-কিশোরীদের ১৪-২৯ বছর বয়সে আত্মহত্যার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে প্রেম ও বিয়ে।
তিনি বলেন, ১৮ বছরের আগে শুধু শহরে বিয়ে বেড়েছে তা নয়, মফস্বল শহরগুলো থেকেও আমরা এমন অনেক কেস পাই। মফস্বলের ছেলে-মেয়েরা মনে করে প্রেম করে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো বড় স্মার্টনেসের ভিডিও ধারণ কারও স্মার্টনেসের অংশ। তাই তারা পিছিয়ে না থেকে এগিয়ে যেতে চায়। তারা যখন একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে জড়িত হয়, তখন তাদের মানসিক বৈকল্য শুরু হয়। তারা নেশাগ্রস্ত হয়, নিজেদের হাত কাটে। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থকে।
অভিভাবকরা করছেন মামলা
ডেমরার রূপগঞ্জের বাসিন্দা জামিল শেখের সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে তার বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে যায়। তিন দিন তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাবা মামলা করলে পুলিশ ছেলে-মেয়ে দুইজনকে আটক করে।
বাবা জামিল জানান, তারা অপরহণ মামলা করেন, পরে মেয়েকে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার আদেশ দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটির আইনি সহায়তা প্রকল্প ও আশ্রয়কেন্দ্রের উপ-পরিচালক অ্যাডভোকেট নিঘাত সীমা বলেন, এমন অপহরণের মামলাগুলো ২০১২-১৩ সাল থেকে বাড়তে শুরু করে। এর ওপর করোনার একটা বড় প্রভাবও রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারের করা অপহরণের মামলাগুলো টেকে না। কারণ মেয়েরা ভালোবেসে বিয়ে করে বলে পরিবারের সঙ্গে নয় বরং প্রেমিকের সঙ্গে যায়।
ভিকটিম সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের ডিসি হুমায়রা পারভিন ইত্তেফাককে বলেন, মাসে ১৫-২০টি ১৮ বছরের নিচে অপহরণের মামলার কিশোরীদের সেবা দেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের পরিবার ছেলের পরিবারের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসে। কেউ কেউ বিয়ে করে বলে ছেলের সঙ্গে চলে যায়।
নিজের আর শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ে
আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিআইসিউতে এক কিশোর-কিশোরী বাবা-মা তাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে আসেন আশঙ্কাজনক অবস্থায়। কিশোরী মা তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করতে পারায় শিশুটির সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছিল।
পিআইসিউ-ও প্রধান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা মো হানিফ বলেন, একজন শিশুর ১৮ বছর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২১ বছর লাগে পূর্ণ মানুষ হতে। এর আগে কোনো মেয়ে যদি মা হয় তাহলে তার নিজের ও শিশুর পুষ্টি ঘাটতি দেখা দেয়। প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মও হতে পারে। কিশোরী মা নিজের ও শিশুর দেখাশোনা সঠিকভাবে করেত পারে না বলে অপুষ্টির শিকার শিশুর সমস্যা বেড়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক সুরাইয়া বেগম বলেন, কিশোরী মা হলে রক্তস্বল্পতা, খিঁচুনি প্রভৃতি জটিলতার আশঙ্কা অনেক বেশি হয়। যে কারণগুলোতে মা ও শিশুর মৃত্যুও ঝুঁকি থাকে তার বেশিরভাগ আশঙ্কা থাকে কিশোরী মা হওয়ার ক্ষেত্রে।
বাড়াতে হবে বিনিয়োগ ও সচেতনতা
বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি-২০২৩ প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে ২০০৬ থেকে ২০২২ সালের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগেই ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএ-র সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে এখন এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, বাবা-মাকে ছেলে-মেয়ের সঙ্গে প্রেমের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। নিজেদের প্রেমের গল্পও তারা সন্তানদের সঙ্গে করতে পারেন।
পরিবারে প্রেম ভালোবাসা নিয়ে আলোচনার কথা বলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, শিশুদের বুঝাতে হবে নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব স্বাভাবিক। শিশুদের সঠিক শৈশব নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাদের সংবেদনশীলতা, কিশোর ক্ষমতায়ন হওয়া, ইতিবাচক হতে সহযোগিতা করা এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারার পরিবেশ দিতে হবে। এর ফলে তাদেরকে ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্ট্ররাল প্রকল্প পরিচালক ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাল্যবিবাহ রোধে জিরো টলারেন্স অবলম্বন করছেন। হেল্প লাইনের মাধ্যমে অনেক বাল্য বিবাহ ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।