সদ্য প্রয়াত কবি আসাদ চৌধুরী শেষ জীবনে সপরিবারে কানাডায় অভিবাসী হয়েছিলেন। ফলে বাসস্থান টরন্টোতে গড়ে উঠেছিল তার আরেক সামাজিক পরিবার। কয়েক বছরেই বাঙালি কমিউনিটিতে মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। স্থানীয় প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আরও ব্যাপক জনপ্রিয় ও সমাদৃত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তার মৃত্যু্তে কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কানাডা প্রবাসী কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-সংস্কৃতি কর্মীরা মন্তব্য প্রকাশ করে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ইত্তেফাকের কাছে পাঠানো তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি উপস্থাপিত হলো:
সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘এই বেদনা অসহনশীল। আসাদ চৌধুরী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের গর্ব ও আমাদের কমিউনিটির একজন অভিভাবক। আমরা অভিভাবহীন হয়ে পড়লাম।’
কবি মাসুদ খান বলেছেন, ‘ওহো, স্যাড নিউজ। কবির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছি, তাঁর আত্মাশান্তি কামনা করছি।’
কবি ও শিল্পী রাকীব হাসান বলেন, ‘তাকে যতটুকু কাছে থেকে দেখেছি, সত্য বলার এমন অকপট মানুষ কমই দেখেছি! প্রথম কবিতার বই তবক দেয়া পান দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের আপ্যয়নে কার্পন্য করেননি, বরং মুগ্ধ করেছিলেন। বিটিভিতে প্রচারিত তার প্রচ্ছদ অনুষ্ঠান দেখে অনেকের মতো আমিও তাকে প্রথম চিনি এবং তার ভক্ত হয়ে যাই। তিনি তখন আমাদের সবচেয়ে স্মার্ট কবি, সেই তুমুল যৌবনে আসাদ ভাই ছিলেন আমাদের প্রিয় আনন্দ-আইকন, আমি তাঁর মতো স্মার্ট কবি হতে চাইতাম!’
তার সঙ্গে আমারও অনেক স্মৃতি আছে, তার মৃত্যুতে আজ দুঃখের বাতাস বড় বেশি ওড়াচ্ছে মনে করে ঘুমিয়ে পড়া সেই স্মৃতিদের! বাংলা কবিতা আপনাকে মনে রাখবে আসাদ ভাই, চারপাশ যতটা বেঈমান, কবিতা অতটা নয়!’
কবি ও কথাশিল্পী নাহার মনিকা বলেন, ‘বাংলা কবিতার উজ্জ্বল নক্ষত্র চলে গেলেন। তাঁর কবিতা আছে, থাকবে। আমরা তার বাগ্মিতা, স্মিত হাস্য, শৈল্পিক ও দৃঢ় প্রতিবাদকে হারালাম। বাংলা সাহিত্য অভিভাবকশূন্য হচ্ছে।’
কথাশিল্পী জসিম মল্লিক শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, ‘ষাট দশকের অন্যতম প্রধান কবি আসাদ চৌধুরীর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য বিরাট ক্ষতি। তাঁর সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল তিন মাস আগে টরন্টোর মাইকেল গ্যারন হাসপাতালে। তখনও তিনি কথা বলেছেন, স্বভাবজাত রসিকতাও করেছেন। কথার যাদুকর আসাদ ভাই শেষ কয়েকবছর কানাডার টরন্টোতেই ছিলেন নিজ সন্তানদের কাছে। তার সরব উপস্থিতি সবসময় কমিউনিটির জন্য আনন্দদায়ক ছিল। তিনি সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। তার শূন্যতা টরন্টোবাসী অনুভব করবে।’
সাংবাদিক মাহবুব ওসমানী বলেন, ‘কত স্মৃতি প্রিয় মানবিক কবি আসাদ চৌধুরীর সাথে। টরন্টোয় সিবিএন২৪-এর অফিস উদ্বোধন, সিবিএন মুদ্রণ পত্রিকার প্রথম প্রকাশনা উৎসব, নানা সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলাপচারিতা, ঢাকায় চ্যানেল২৪-এ আমার টকশোতে কতবার অতিথি হিসেবে পাওয়া। শেষবার দেখা গত ৬ জুলাই, আরেক কবি প্রিয় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ভাইকে সঙ্গে নিয়ে টরন্টোর মাইকেল গেরন হাসপাতালে আসাদ ভাইকে দেখতে যাই। তখনও আমাদের সঙ্গে একটু-আধটু কথা বললেন। কবি ফুল ভালোবাসতেন। তাই আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা নিতে কার্পণ্য করেননি। এসবই এখন স্মৃতি।’
কথাশিল্পী সালমা বাণী জানান, একজন কবি যাকে একান্ত কাছে থেকে দেখেছি। কখনওই তার মুখে হাসি ছাড়া দেখিনি। তিনি আজ তার অগুণতি পাঠক আর ভক্তদের দুঃখ, কস্ট, শোকের মহাসাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন না ফেরার জগতে। কিন্তু তিনি তার তবক দেয়া পানের মায়াময় মোহন হাসি নিয়ে হাসতেই থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
লিটন মাসুদ বলেছেন, ‘পৃথিবীর বহুদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন, মনের মাধুরী মিশিয়ে কবিতা গল্প লিখেছেন, বাংলাদেশের মানুষের অনেক কাছের ছিলেন। আমারা কানাডাপ্রবাসীরা ভাগ্যবান ছিলাম, কবি সব দেশ ঘুরে সবশেষে কানাডা থিতু হলেন। টরেন্টোর সকল অনুষ্ঠানে তার স্বরব উপস্থিতি ছিল আমাদের জন্য আনন্দের। কবি এলেন কানাডাপ্রবাসীদের মন জয় করলেন। আজ তিনি আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেলেন।’
ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘সাহিত্য ও কবিতার জগতে তার অবদান ছিল সত্যিই অসাধারণ। তার কথা ও কবিতা অনেকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। তার ভাষার শক্তি অনন্তকাল বাঙালিদের কাছে একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে। তার শূন্যতা বাংলা সাহিত্যে সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আসাদ চৌধুরীর তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।’
রুনা লায়লা ওরফে আলেয়া রোজ বলেন, ‘কবি আসাদ চৌধুরী আমাদের অতি প্রিয় কবি। আমাদের সাহিত্যের প্রদর্শক। অপরিসীম ভালোবাসার এক মানুষ। সদা হাস্যজ্জ্বল প্রাণবন্ত একজন মানুষ ছিলেন, অসংখ্য কবিতার মাঝে হৃদয় এ দাগ কেটে যাওয়ার মতো কবিতা বুকের মধে নড়ে, সত্য ফেরারি, ফাগুন এলেই এমন অনেক কবিতা বুকের মধ্যে বাস করে। ঘর ছেড়ে কানাডা আসলেন আবার ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। কবির বইয়ের নাম দিয়েই বলি- ঘরে ফেরা সোজা নয়।’
মনিস রফিক বলেন, ‘কবি আসাদ চৌধুরী টরন্টো শহরে আলোয় রাঙানো এক সময় এনেছিলেন। প্রায় এক দশক এই শহরে তার বসবাস আমাদের প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করেছে। সহজে সবাইকে আপন করে নেয়ার তার অদ্ভুত ক্ষমতা টরন্টোর বাঙালিরা কখনও ভুলতে পারবে না। সেই সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিকতা নিয়ে তার কথামালা যেভাবে তরুণ প্রজন্মকে আন্দোলিত করেছে, সেটা সামনের দিনগুলোতে অন্য কেউ এমনভাবে পারবেন কিনা, আমি জানি না। আসাদ চৌধুরী এই শহরে এসেছিলেন, মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, আর সবার কাছ থেকে এক অন্য রকম গাঢ় ভালোবাসা নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। টরন্টোতে বাংলা সংস্কৃতির প্রগাঢ় উন্মেষের সময় আসাদ চৌধুরীর সরব এবং দায়িত্বপূর্ণ উপস্থিতি ইতিহাসে অতি সম্মানের সঙ্গে লেখা থাকবে।’
সাংবাদিক সুব্রত নন্দী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন থেকে তার সুভাষিত মিষ্টি উপস্থাপনার বিটিভির সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রচ্ছদের ভীষণ ভক্ত ছিলাম। জীবনের শেষ প্রান্তে এই প্রবাসে এসে তাকে খুব কাছে পেয়েছিলাম। অসুস্থ শরীরেও বাঙালিদের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আমাদের উৎসাহ যুগিয়েছেন। আজ থেকে সেই জায়গাটা খালি হয়ে গেল।’
এদিকে অন্টারিও সংসদ অধিবেশন থেকে এম পি পি ডলি বেগম ইত্তেফাককের কাছে পাঠানো এক শোক বার্তায় কবি আসাদ চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন। এছাড়া অপর এক বিবৃতিতে ডলি বলেন, ‘সাহসী, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর কবি আসাদ চৌধুরীর প্রয়াণে গভীরভাবে মর্মাহত, শোকাহত। গতকাল বৃহস্পতিবার কানাডার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা। আমরা কানাডাপ্রবাসীরা তার মতো বরেণ্য কবিকে কাছে পেয়ে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করছি। আসাদ চৌধুরী একাধারে কবি, লেখক, অনুবাদক, সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি একজন সংস্কৃতি কর্মী। অসংখ্য শিশুতোষ ছড়া, প্রবন্ধ সংগ্রহ ও জীবনী লিখেছেন তিনি। কবি আসাদ চৌধুরী ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফরাসি, জার্মান ও মালয়ালাম ভাষায় ছিলেন সুপটু।