রাজশাহী বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছেই। এই অঞ্চলের ৭১ ভাগ এলাকা মাঝারি, উচ্চ ও অতিউচ্চ পানি সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। সরকারের ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের (ওয়ারপো) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আই.ডব্লিউ.এম) কর্তৃপক্ষ বৃহত্তর রাজশাহীর ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহীর ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানি পরিস্থিতি নিয়ে হাইড্রোলজিক্যাল অনুসন্ধান ও মডেলিং’ শীর্ষক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গবেষণাটি ২০১৮ সালে বৃহত্তর রাজশাহীর নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার ২৫টি উপজেলার দুই শতাধিক এলাকায় শুরু হয় এবং চলতি ২০২৩ সালের জুনে ওয়ারপোর অনুমোদন পায় এবং গত আগস্টে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কম বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমশ নিচে নামছেই। গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত রাজশাহীর তানোর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমেছে ১১৩ ফুট পর্যন্ত।
গবেষণার তথ্যে বলা হয়, ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল ২৬ ফুট নিচে। ঐ সময় তানোরে পানির স্তর সর্বোচ্চ নেমেছিল ৬৮ ফুট নিচে। খাওয়ার পানি ছাড়াও কৃষিজমিতে সেচ এবং মাছ চাষে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় ২০১০ সালে পানির গড় নিম্নস্তর ছিল ৫০ ফুট। ২০২১ সালে ভূগর্ভস্থ পানির গড় নিম্নস্তর আরও নিচে নেমে দাঁড়ায় ৬০ ফুটে। একই বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ভূপৃষ্ঠ থেকে পানির স্তর নামে ১৫৩ ফুট পর্যন্ত।
গবেষণার তথ্যমতে, বৃহত্তর রাজশাহীর তিন জেলার ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮৭টি ইউনিয়ন অতিউচ্চ ও উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নেমেছে পোরশার ছয়টি এবং নাচোলের চারটি ইউনিয়ন এলাকায়। এছাড়া অতিউচ্চ পানি সংকটে রয়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও নিয়ামতপুর এবং নওগাঁর সাপাহারসহ ৯ উপজেলার ৩৭টি ইউনিয়ন এলাকায়। গবেষণায় ৪০টি ইউনিয়নকে ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ ও ৬৫টি ইউনিয়নকে ‘মাঝারি পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। তবে আশার খবর, এই অঞ্চলের ২৮টি ইউনিয়ন ‘কম পানি সংকটাপন্ন’ ও ৩৪টি ‘খুবই কম পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা বলে বিবেচিত হয়েছে।
এদিকে, নওগাঁ জেলার কয়েকটি এলাকায় ১৫০০ ফুট মাটির নিচেও মেলেনি ভূগর্ভস্থ সিক্ত শিলাস্তর। রাজশাহীর তানোরে একটি মাত্র পাতলা ৫০ ফুটের অ্যাকুইফার (সচ্ছিদ্র শিলাস্তর) পানির উৎস হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে পানির পুনর্ভরণ না হওয়ায় দেখা দিয়েছে সংকট।
গবেষণায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি জানান, ‘উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের সকল বিল খনন করে পানির আধার তৈরির কথা বলা হয়েছে। যাতে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করলে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমবে। এছাড়া অধিক সেচনির্ভর বোরোর পরিবর্তে কম সেচের ফসল আবাদ করতে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বরেন্দ্র এলাকায় প্রচুর বৃক্ষ রোপণ করতে হবে, তাহলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত বাড়বে। বৃষ্টিপাত বাড়লে পানি রিচার্জ হবে।
এক্ষেত্রে চলতি বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলের রেকর্ড বৃষ্টিপাত (৩৩০ মিলিমিটার) বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই বৃষ্টিতে শহরে জলাবদ্ধতা এবং গ্রামের হাজার হাজার হেক্টর জমির সবজি ডুবে এবং শত শত পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় কয়েক শ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে এই রেকর্ড বৃষ্টি সবজি ও মাছের উল্লিখিত ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে যে লাভ হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ’ বলে অভিমত ভূতাত্ত্বিক গবেষকদের।
বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ জানান, শুধু বিএমডিএ একা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে না। ব্যক্তি পর্যায়েও ডিপ ও সেমিডিপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। বিএমডিএ নতুন করে গভীর নলকূপ না বসানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে পদ্মা ও মহানন্দার পানি এনে সেচের ব্যবস্থা, জলাধার খনন, সংস্কার, পানির অপচয় রোধসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া খাল খনন করে ভূ-উপরিস্থ পানির আধার তৈরি করা হচ্ছে।