যে কবিতা শুনতে জানে না/ সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না/ যে কবিতা শুনতে জানে না/ সে সূর্যকে হৃদপিণ্ডে ধরে রাখতে পারে না...
একবিংশ শতাব্দীর এই অস্থিরতার যুগে মানুষ যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবলভাবে আসক্ত; বই পড়া থেকে শুরু করে সৃজনশীল চর্চায় যখন নিদারুণ দুর্ভিক্ষ- তখনই ফেসবুককে ব্যবহার করে যে পেজটি শুদ্ধতম সাহিত্যের ধারা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তার নাম ‘কবিতা ফেসবুক পেজ’। ২.৩ মিলিয়ন ফলোয়ার সমৃদ্ধ এই পেজটির যাত্রা ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, যা দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কবিতার নিখাদ রস মানুষের মাঝে পৌঁছে দিয়ে অর্জন করেছে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা।
মানুষ তার যাপিত জীবনের দুঃখ-কষ্ট-হতাশায় কবিতাকে সঙ্গী করে নিচ্ছে, কবিতা যেন হয়ে উঠছে তাদের জীবনের একান্ত আশ্রয়স্থল। যে কথা কাউকে বলা যায় না, সেই কথাই যেন কবিতার মধ্য দিয়ে আস্বাদন করছে এই নাগরিক-গুহাবাসী মানুষেরা। একটি কবিতা তখনই মানুষের কাছে ছড়িয়ে যায়, যখন মানুষ সেই কবিতায় নিজেকে খুঁজে পায়; যেখানে কবিতা কেবল মন খারাপের সঙ্গী নয় বরং কবিতার শক্তিশালী জীবনবোধ মানুষকে শত বাঁধা পেড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রেরণা যোগায়। মানুষের কাছে কবিতার মর্মবাণী পৌঁছে দেওয়ার কাজটিই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছে ‘কবিতা পেজ’।
যার হাত ধরে লাখো পাঠকের কাছে কবিতা পৌঁছে গেছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে শুদ্ধতার সৌন্দর্য, তিনি পেজের অ্যাডমিন মো. নজরুল হায়দার। আপাদমস্তক শুদ্ধ সংস্কৃতির ধারক এই মানুষটি পেশাগত জীবনে একজন আইনজীবী হলেও, কবিতাকে ভালোবেসে শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা ও সুন্দর জীবনবোধকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। তার সূত্র ধরে ডানা মেলেছে কবিতা প্রকাশনী, যার মাধ্যমে সৃজনশীল তরুণ লেখকরা আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন। কবিতার কর্মকাণ্ড এতেই সীমাবদ্ধ নয়, কবিতা পেজ শুদ্ধ উচ্চারণ, আবৃত্তি ও উপস্থাপনার ওপর কর্মশালার আয়োজন করে যাচ্ছে বছরব্যাপী! অনলাইনে শুদ্ধ উচ্চারণে মায়ের ভাষায় কথা বলা, কবিতা আবৃত্তি ও উপস্থাপনার মতো কর্মশালায় অসংখ্য মানুষ যুক্ত হচ্ছে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের নিমিত্তে।
জানতে চাইলে মো. নজরুল হায়দার বলেন, মন ভালো থাকুক অথবা খারাপ, কবিতা এমন এক অনুভূতি, যা মনকে প্রশান্তি দেবেই। আমি শুধু চেয়েছি, যে মনের কথাটুকু বলতে চাচ্ছে অথবা বলতে চেয়েও পারছে না, সে শুধু কবিতা দিয়ে তার অনুভূতিটা বুঝিয়ে দিক। এই দীর্ঘ পথচলায় সবসময়ই একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল, কবিতা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কীভাবে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো যায়। তারই অংশ হিসেবে তরুণ কবিদের জন্য প্রতি বছর উদীয়মান কবিদের কাব্য সংকলন প্রকাশ, অনলাইনে আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, অনলাইনভিত্তিক শুদ্ধ উচ্চারণ, আবৃত্তি, উপস্থাপনার কর্মশালা ইত্যাদি সৃজনশীল কার্যক্রম জায়গা করে নিয়েছে। হুট করে পেজে ঢুকলে পাঠকের মনে হবে, এ তো আসলেই কবিতার রাজ্য! অগণিত পাঠক অনেক দিনের পুরনো কবিতা খুঁজে পেয়েছেন এখানে। কবিতার প্রতি পাঠকের ভালোলাগা যে আজও এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কমে যায়নি, সেটা আসলেই বিস্ময়।