‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান তখন তুঙ্গে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানে ফুঁসে উঠেছে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা। সারাদেশ যখন আইয়ুব বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল, ঠিক তখনই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন একজন ছাত্রনেতা। তিনি আসাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের চান খাঁর পুলের আইয়ুব গেটের সামনে বিক্ষোভরত অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। আসাদকে হত্যার প্রতিবাদে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে দাবি ওঠে- শহীদ আসাদের রক্তের বদলা নেবো। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে গদি থেকে সরাবোই। আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। শেখ মুজিবকে জেলের বাইরে আনবোই।
পুলিশের গুলিতে আসাদ নিহত হওয়ার পর কবি শামসুর রাহমান লিখলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতা। লিখেছেন-
‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো বা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।’
নরসিংদীর ছেলে আসাদ হত্যার প্রতিবাদে ২১-২৪ জানুয়ারি একগুচ্ছ কর্মসূচি পালন করে ঢাকায় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম কমিটি। ২১ জানুয়ারি ধর্মঘটে তারা ২২ জানুয়ারি শোক দিবস, ২৩ জানুয়ারি কালো পতাকা মিছিল ও ২৪ জানুয়ারি ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করে।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে আসায় কারফিউ জারি করেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। কিন্তু সেদিন আইয়ুবের কারফিউ কেউ মানেনি। সমুদ্রের স্রোতের মতো জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ে রাজপথে। কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম কমিটির ধর্মঘটে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে কিশোর মতিউর, রুস্তমসহ আরও কয়েকজন নিহত হন। আসাদের শার্ট হাতে ঝুলিয়ে শপথ নিয়েছিল বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা, মতিউরের লাশ কাঁধে নিয়ে সেই শপথ আরও দৃঢ় হয়। আইয়ুব খান সরকারের পতনের দাবিতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতা।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’
- কবি হেলাল হাফিজ (নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়)
পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. শামসুজ্জোহা হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে গণঅভ্যুত্থান আরও বেগবান হয়। অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যান্য আসামিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আইয়ুব খান সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) শেখ মুজিবকে এক সংবর্ধনা সভায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন ছাত্র-সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ। তখন থেকে শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন ‘বঙ্গবন্ধু’।
পুলিশের গুলিতে শহীদ আসাদ কে
‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে শহীদ আসাদ ছিলেন একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা। তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর শিবপুরের ধানুয়া গ্রামের হাতিরদিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। আসাদের বাবা মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের বিএবিটি হাতিরদিয়া সাদত আলী হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হেডমাস্টার ছিলেন। পাশাপাশি তার মা মতি জাহান খাদিজা খাতুন নারায়ণগঞ্জ ইসলামী এডুকেশন ট্রাস্ট (আইইটি) গার্লস প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। আসাদের জন্মের পর শিক্ষকতা ছেড়ে দেন তার মা। আসাদুজ্জামান আসাদ ৮ ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন চতুর্থ।
গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো বা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।
- কবি শামসুর রাহমান (আসাদের শার্ট)
শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ও এমসি কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৬৬ সালে বিএ ও ১৯৬৭ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এ বছরই আসাদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও কৃষক সমিতির সভাপতি মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানির নির্দেশনায় কৃষক সমিতিকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা ও নরসিংদীতে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন।
‘৬৯-এ পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। শহীদ আসাদ তৎকালীন ঢাকা হল (বতর্মান শহীদুল্লাহ হল) শাখার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু-মেনন গ্রুপ) ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন আসাদুজ্জামান। শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে গণআন্দোলনে যখন পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল হয়ে পড়েছে, তখন আসাদের মৃত্যু এদেশের মুক্তিকামী জনস্রোতকে আরও বেগবান করে তোলে।
পুলিশের গুলিতে আসাদ নিহতের প্রতিবাদে তার মৃত্যু নিয়ে কবি হেলাল হাফিজ একই বছর ১ ফেব্রুয়ারি লেখেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা। তিনি লিখলেন-
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'