মেলা। মিলে থাকা, মিলে আসা। সারি সারি জিনিসের মেলা। তার ওপর মানুষের মিলন। এক কথায় সুন্দর মিলন। এমন, মেলায় ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা সবারই কম-বেশি আছে। ভেঁপু বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফেরার আনন্দই অন্যরকম। না এ-এমন মেলা নয়। রাজধানীর বুকে বাংলা একাডেমি চত্বর। তার চারপাশ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। তাতে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মেলা বসে। চারপাশ ঘিরে অনেক কিছু থাকলেও প্রাণটা থাকে বইয়ের মেলায়। ভাষার মাস। শহিদদের প্রতি সম্মান জানাতে এ উদ্যোগ। সারাদেশ থেকে লোক আসে। সব বয়সীরা আসে। বড়দের বই থাকে সেখানে। থাকে ছোটদেরও। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই থেকে শুরু করে গল্প-উপন্যাস-কবিতা-ছড়া কী নেই তাতে! খ্যাতিমানদের জীবনীগ্রন্থ থাকে। তাতে জানা যায়, তারা কেমন করে বড় হলেন। কেমন করে সাহিত্যিক হলেন। কেমন করে পড়ুয়া হলেন। লেখায় কেমন করে হাত পাকালেন। কত কত বই। সেখানে রূপকথার রাজা-রানির গল্প। সেখানে দস্যু-ডাকাতের কথা, রাক্ষস-খোক্ষসের কথা; ভূতের কেচ্ছা তো রয়েছেই।
ছোটদের কথা মনে হলেই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র কথা মনে পড়ে। ঝিল্লিরাতে কত কথা, একদিন দাদু-দিদিরা শোনাতেন। সেইসব গল্পে সোনালি শৈশব ছিল বেশ কিছুদিন আগেও। দৈত্য-দানোর কথা, আরব্যরজনীর সিন্দবাদের কথা, আলিবাবা চল্লিশ চোরের গল্প, কতদূর থেকে আমাদের দেশে চলে এসেছে। ইংরেজ আমলে বই প্রকাশ পেলে, মুখে বলা গল্পগুলোর অন্য স্বাদ এসেছে। ছবি আঁকা সে-সব গল্প বইয়ের মজাই আলাদা। দিন গড়াচ্ছে বই বাড়ছে। সেই বই পাঠাগার লাইব্রেরি থেকে ফুটপাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। বাড়ছে মানুষ। শিক্ষার্থী বাড়ছে। জ্ঞানান্বেষণের চাহিদা বাড়ছে। বিদেশ থেকে বই আসছে। অনুবাদ হচ্ছে। অনুকরণ হচ্ছে। ফলে বইয়ের বিক্রেতা-পাঠক বাড়ছে। পত্র-পত্রিকার মধ্য দিয়ে নানাভাবে সাহিত্য প্রকাশিত হচ্ছে। এত যে কথার ফুলঝুরি; সে-সব কি আর ছোট জায়গায় আঁটে? তাই মেলার আয়োজন। প্রকাশক বইয়ের ডালি নিয়ে হাজির হবেন। লেখকগণ দেখবেন তাঁদের বইয়ের কত কদর। পাঠক দেখবেন তাঁর রুচিমাফিক বই মিলছে কি না। ব্যাস, হয়ে গেল বহুপক্ষের মিলন। সেই মিলনেই মেলা। তাও আবার নতুন বই প্রকাশের হিরিক। একসঙ্গে এতবই আর কখনো হয় না, তাই মেলার ক্ষণের জন্য সবার অপেক্ষা।
ছোট্টমণিরা তাকিয়ে থাকে বইমলায়। কে কে তাদের জন্য বই নিয়ে এসেছে। তারা চায় তাদের মতো করে লেখা গল্প, কবিতা-ছড়া। গদ্যও চায় তারা। দেশের ইতিহাস জানতে চায়, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জানতে চায় তারা। মনীষীদের জীবনী পাঠ করে জানতে চায় তাঁদের জীবন সংগ্রাম, যেমন—আব্রাহাম লিংকন কেমন করে গাড়ি ঠেলেছিলেন, নিউটনের সামনে কেমন করে আপেল পড়েছিল, কেন সেটা তাঁর খাবার কথা মনে পড়ল না। নিষ্ঠা থাকলে গরিব মানুষও কেমন করে বিখ্যাত হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষরা কেমন করে পৃথিবীতে অবদান রাখে। বইয়ের পাতায় পাতায় কত তত্ত্ব, কত উপদেশ—যা নানাভাবে শিশুমনে প্রভাব ফেলে। বইয়ের মধ্যেই জানা যায় কবি রবি’র স্কুল কামানোর গল্প, নজরুলের ডানপিটে জীবন, জগদীশ বসুর আবিষ্কারের নেশার কথা। এমনসব গল্প শিশুমনকে বিকশিত করে। কারো খেলোয়াড়ি জীবন, কারো বা রাজনীতির মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের মুক্তি ছিনিয়ে আনার গল্প। স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ এবং মানুষের মন জয় করার ইতিহাস জানার জন্য দূরে যেতে হয় না, বঙ্গবন্ধুই যথেষ্ট। সে-সব কথা, বই থেকে জানা যায়। জানতে পারা যায় ছোট্ট রাসেলের হারিয়ে যাওয়া জীবনের বেদনা গাথা।
জানা যায়, ছাত্ররা কেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে নিজের জীবন দিয়ে সংগ্রাম করেছিল। বাহান্ন থেকে একাত্তরের হার না মানা গল্প তো সিন্দাবাদের গল্পের চেয়ে কম নয়। এসব গল্প-সাহিত্যে একদিকে থাকে বাস্তব চরিত্র, অন্যদিকে কল্পলোকের ভুবনের নায়ক-নায়িকা। দুইয়ে মিলেই আজকের যারা শিশু তারাই ভবিষতের রাষ্ট্র-কর্ণধার। বর্তমানে নতুন প্রযুক্তি এসেছে। কাগজের পৃষ্ঠায় লেখার চেয়ে কদর বেড়ে চলেছে ‘ই-বুক’, ইউটিউব ইত্যাদির। সারা পৃথিবী জুড়ে এর রমরমা অবস্থা। তাই বলে প্রকাশিত গ্রন্থের দিন শেষ হয়ে যাবে তা নয়। এ গ্রন্থের ঘ্রাণ যে একেবারেই আলাদা। প্রকৃতির মাটি ছোঁয়া ঘ্রাণের যেমন আনন্দ থাকে, নদীর ঢেউয়ে যেমন ছন্দ থাকে, গাছের সবুজে, আকাশের নীলে, রোদের ঝিলিমিতে যে খেলা, সে-খেলাই খেলতে দেয় নতুন বই। বইমেলায় এসে এ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আনন্দ এবং একই সাথে বাহ্যিক জ্ঞান আহরণও চলে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে। তাই প্রকাশক-লেখকের চোখে যেমন হাসির ঝিলিক, তেমনি কচি-কাঁচা প্রাণ শিশুরা নতুন জ্ঞানানন্দে বিভোর হয়। নতুন অভিজ্ঞতার ছোঁয়ায় সে ভ্রমণ করে বিশ্বজোড়া পাঠশালার কোনো এক ভুবনে। সেই ভুবনটি যদি হয় একুশের বইমেলা, তবে তো মজাই আলাদা।