মুরগির ডিমের মতো দানা

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৬:৩৫

একদিন কয়েকজন শিশু এক উপত্যকায় ভুট্টার দানার মতো একটা জিনিস দেখতে পেল—যার মাঝখানে খাঁজকাটা, আর মুরগির ডিমের মতো বড়ো। এক পথিক ওই পথ ধরে যাবার সময় জিনিসটা দেখে বাচ্চাদের কাছ থেকে এক টাকায় কিনে নিলেন। তিনি ওটা শহরে নিয়ে গিয়ে কৌতূহলবশত রাজার কাছে বিক্রি করে দিলেন।

রাজা তার জ্ঞানী লোকদের একত্রিত করলেন। তারপর জিনিসটি কী হতে পারে, তা তাদের খুঁজে বের করতে বললেন। জ্ঞানী ব্যক্তিরা চিন্তা-ভাবনা করে এর আগামাথা বের করতে পারলেন না।

জিনিসটা গোবরাটের ধারেই পড়ে ছিল। একদিন এক মুরগি উড়ে এসে ওটাকে খোঁচাতে খোঁচাতে ওটার গায়ে একটা গর্ত তৈরি করে ফেলল। তারপর এক-এক করে সবাই দেখল যে, এটা একটা ভুট্টার দানা। জ্ঞানীরা রাজার কাছে গিয়ে বললেন, ‘এটা ভুট্টার দানা।’

এতে রাজা খুব অবাক হলেন। এরকম ভুট্টা কখন, কোথায় জন্মেছিল তা খুঁজে বের করতে পণ্ডিত ব্যক্তিদের হুকুম দিলেন। পণ্ডিতগণ আবারও ভাবতে বসে গেলেন। তারা বইয়ের পাতা ঘেঁটে খুঁজলেন; তবে কিছুই খুঁজে পেলেন না। তাই তারা রাজার কাছে ফিরে এসে বললেন, ‘মহারাজ, আমরা আপনাকে এর কেনো সমাধান দিতে পারছি না। আমাদের বইতে এ বিষয়ে কিছুই নেই। বরং চাষিদের জিজ্ঞেস করতে হবে। সম্ভবত তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের পিতার নিকট থেকে শুনে থাকতে পারেন যে, কখন এবং কোথায় এত বড়ো আকারের শস্য জন্মাত।’

তাই রাজা তার সামনে কিছু বৃদ্ধ কৃষককে নিয়ে আসতে হুকুম দিলেন।

পেয়াদারা এমন একজনকে খুঁজে পেয়ে রাজার কাছে নিয়ে গেল। বুড়োর মেরুদণ্ড বাঁকা, গায়ের রং বিবর্ণ, মুখে দাঁত নেই। সেই বুড়ো কেবল দুটি ক্রাচে ভর দিয়ে টলতে টলতে রাজার সামনে এসে উপস্থিত হলেন।

রাজা তাকে শস্য দেখালেন। বুড়ো খুব কমই দেখেন; তবে তিনি এটি নিজের হাতে নিয়ে অনুভব করলেন। রাজা তাকে বললেন, ‘হে প্রবীণ, আপনি কি আমাদের বলতে পারেন, এত বড় দানা কোথায় জন্মেছে? আপনি কি কখনো এ ধরনের ভুট্টা কিনেছেন বা আপনার খেতে বপন করেছেন?’

বুড়ো লোকটি এতটাই বধির ছিল যে, রাজা যা বললেন তা তিনি খুব কমই শুনলেন এবং খুব কষ্ট করে বুঝে নিলেন।

শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ বললেন, ‘না, আমি আমার খেতে এটার মতো ভুট্টা বপন করিনি বা কাটিওনি, এমনকি কখনো ক্রয়ও করিনি। আমরা যখন ভুট্টা কিনতাম, তখন দানাগুলো এখনকার মতোই ছোট ছিল। তবে আপনি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তিনি হয়তো শুনেছেন—কোথায় এমন শস্য জন্মে।’

রাজা বৃদ্ধের বাবাকে ডেকে পাঠালেন। খোঁজাখুঁজি করে তাকে রাজার সামনে আনা হলো। তিনি একটি ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে এলেন। রাজা তাকে শস্যটি দেখালেন। বৃদ্ধ কৃষক এখনো ভালোই দেখতে পান। তাই তিনি ভালো করে দেখে নিলেন। এবার রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে প্রবীণ, আপনি কি আমাদের বলতে পারেন, এত বড় দানা কোথায় জন্মেছে? আপনি কি কখনো এধরনের ভুট্টা কিনেছেন বা আপনার খেতে বপন করেছেন?’

যদিও বৃদ্ধ লোকটির শুনতে কষ্ট হলো, তবুও তিনি তার ছেলের চেয়ে ভালোই শুনতে পেলেন।

তিনি বললেন, ‘না, আমি আমার খেতে এরকম ভুট্টা কখনো বপন করিনি বা কাটিওনি। তাছাড়া আমাদের সময়ে টাকার প্রচলন ছিল না বলে  কখনো তা ক্রয়ও করিনি। প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ভুট্টা জন্মাত; যখন কোনো প্রয়োজন হতো, তখন আমরা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতাম। তাই এমন ভুট্টা কোথায় বেড়েছে, তা ঠিক বলতে পারব না। আমাদের সময়ে শস্যদানাগুলো বড়ো ছিল এবং বর্তমানের শস্যের চেয়ে বেশি আটা পাওয়া যেত। তবে আমি কখনো এরকম ভুট্টা দেখিনি। আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি যে, তার সময়ে শস্যদানা বেশ বড়ো হতো আর আমাদের সময়ের চেয়ে বেশি আটা পাওয়া যেত। মহারাজ, আপনার তাকে জিজ্ঞেস করাই ভালো ছিল।’

রাজা এবার এই বৃদ্ধের বাবাকে ডেকে পাঠালেন। পেয়াদারা তাকে খুঁজে বের করে রাজার সামনে হাজির করলেন। তিনি ক্রাচ ছাড়াই সচ্ছন্দে হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করলেন। তার চোখ দ্যুতিময়, শ্রবণশক্তি প্রখর এবং স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন। রাজা তাকে শস্যটি দেখালেন। বৃদ্ধ দাদু এটি হাতের তালুতে নিয়ে হাতে ঘুরিয়ে দেখলেন।

‘আমি অনেকদিন পরে এত সূক্ষ্ম দানা দেখতে পেলাম।’ বলে তিনি এক টুকরো দানা চেখে দেখলেন।

‘এটা ওই একই ধরনের।’ তিনি বললেন।

রাজা বললেন, ‘দাদাজি, বলুন তো, এমন ভুট্টা কবে ও কোথায় জন্মাত? আপনি কি কখনো এটার মতো ভুট্টা কিনেছেন বা আপনার খেতে বপন করেছেন?’

এবার বৃদ্ধ লোকটি উত্তরে বললেন, ‘আমার সময়ে এধরনের ভুট্টা সব জায়গায় জন্মাত। আমি আমার শৈশবে এসব ভুট্টা চাষ করতাম এবং অন্যদের খাওয়াতাম। এরকম শস্য আমরা বপন করতাম, কাটতাম এবং মাড়াই করতাম।’

এরপর রাজা বললেন, ‘দাদু, আপনি কি এগুলো কোথাও কিনতেন, নাকি প্রয়োজনের পুরোটা নিজেই উত্পাদন করতেন?’

বৃদ্ধ হাসলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘আমাদের সময়ে রুটি কেনা বা বিক্রি করার মতো পাপের কথা কেউ কখনো ভাবেনি, আর আমরা টাকার বিষয়ে কিছুই জানতাম না—প্রত্যেকের নিজের যথেষ্ট ভুট্টা ছিল।’

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে বলুন দাদু, কোথায় আপনার খেত, আর কোথায় আপনি এভাবে ভুট্টা চাষ করতেন?’

দাদু উত্তরে বললেন, ‘আমার খেত ছিল ঈশ্বরের পৃথিবী। আমি যেখানেই লাঙ্গল ঠেলতাম, সেখানেই আমার খেত ছিল। জমি ছিল উন্মুক্ত। এটা ছিল এমন একটা বিষয়, যা কোনো মানুষ তার নিজের বলে দাবি করত না। শ্রমই ছিল একমাত্র সম্পদ, যাকে মানুষ তার নিজের বলে জানত।’

রাজা বললেন, ‘আমার আরো দুটি প্রশ্ন আছে। প্রথমটি হলো, তখন কেন জমিতে এরকম শস্য ফলত, আর এখন তা বন্ধ করে দিয়েছে কেন? দ্বিতীয়টি হলো, কেন আপনার নাতি দুটি ক্রাচ নিয়ে হাঁটে, আপনার ছেলে একটি ক্রাচ নিয়ে আর আপনি নিজে কোনো ক্রাচ ছাড়াই হাঁটেন? আপনার দৃষ্টি প্রখর, দাঁত মজবুত আর আপনার কথা স্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর। এসব কীভাবে হলো?’

বৃদ্ধ জবাবে বললেন, ‘এসব এরকমই, কারণ মানুষ তার নিজের শ্রমে জীবনযাপন করা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা এখন অন্যের শ্রমের ওপর নির্ভর করে। প্রাচীনকালে মানুষ প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে জীবনযাপন করত। তাদের নিজেদের যা ছিল, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত। তারা অন্যের উপার্জন দেখে লোভ করত না।’

মূল: লিও তলস্তয়, রূপান্তর: মোস্তাফিজুল হক
মূলগল্প: অ্যা গ্রেইন অ্যাজ বিগ অ্যাজ অ্যা হেন্স এইগ
অনলাইন সূত্র: রেভোল্টলিবডটকম, ২০২১

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন