দাদুর বাবা ভাষা সৈনিক

একুশে ফেব্রুয়ারি এলে দাদু ছটফট করেন। তার মনের কথা ধরতে পারে ফারিন। ফারিন বেশ বড়ো হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। এই বয়সেই পাকা-পাকা কথা বলে। ও দাদুকে খুব পছন্দ করে। স্কুলের বন্ধুরা কে কী বলল, কী করল, সেই কথাও দাদুকে বলে। দাদু হেসে গলে পড়েন। দোলনায় চড়তে গিয়ে স্নিগ্ধা উলটে পড়ে গেল। হাতে কাদা লেগে গেল। অমনি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল। চোখের পানি মুছতে চোখে হাত দিল। আর মুখেও কাদা লেগে গেল। বন্ধুরা সবাই হাসতে হাসতে শেষ। দাদুও হাসতে থাকেন, ফারিনের গল্প শুনে। তখন ছোট্ট তারিন এসে দাঁড়ায়। বলে, তোমরা হাসো কেন?

দাদু তারিনকে কাছে টেনে বসান। বলেন, ওরে আমার লক্ষ্মী দাদু, আমরা তোমার জন্য হাসি।

তারিন কিছু না বুঝেই হাসতে থাকে। ফারিন বলে, আচ্ছা দাদু, এবারও কি তুমি শহিদ মিনারে যাবে?

:কেন যাব না, দিদিভাই? যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ থাকবে, যাবার শক্তি থাকবে—অবশ্যই যাব।

দাদু কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়েন। ফারিন বুঝতে পারে ওর দাদুর মনের অবস্থা। দাদুর বাবা ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল ছাত্র-যুবক আর সাধারণ মানুষ। ১৪৪ ধারা ভেঙে তারা পথে নেমেছিল। সেইসব মানুষের প্রথম সারিতে ছিলেন দাদুর বাবা। সেদিন তিনিও শহিদ হতে পারতেন। কিন্তু কোনোরকমে প্রাণে বেঁচেছিলেন। পুলিশের গুলি থেকে রক্ষা পেতে দৌড়ে পালিয়েছিলেন। সেদিন শহিদ হয়েছিলেন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম এবং নাম না-জানা আরো অনেকে। দাদু এসব কথা বলেছেন ফারিনকে। ফারিন বইতেও পড়েছে। এবং মিলিয়ে দেখেছে, দাদুর সব কথা সঠিক। কেন ভাষার দাবিতে রাজপথে নামতে হলো?

সেদিনের ক্ষমতায় থাকা পাকিস্তান সরকার, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালি কিছুতেই সেটা মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসেছিলেন। কার্জন হলে একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তখন তার মুখের ওপর ‘নো’-‘নো’ বলে ছাত্ররা প্রতিবাদ করেছিল। তারপর এটা নিয়ে চলতে থাকে আন্দোলন। কত মিটিং, কত মিছিল। এভাবে চলতে চলতে আসে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। এদিন গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় কতজনের বুক। রাজপথ ভেসে যায় রক্তে। সেই তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। উর্দুকে যারা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা পিছু হটে। মানে, তাদের ঘোষণা থেকে তারা সরে যায়। কয়েকবার ভেঙে দেওয়া শহিদ মিনার দাঁড়িয়ে যায়, পাকাপাকিভাবে।

সেই শহিদ মিনার দাদুর প্রাণ। উদাসীন দাদুর মুখে হাত বুলায় ফারিন। বলে, এবার তোমার পরিকল্পনা কী দাদু?

দাদু যেন অন্যজগত্ থেকে ফিরে এলেন। বললেন, নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই, দিদিভাই। গতবার যেরকমটা হয়েছিল, এবারও সেরকম হবে।

ফারিনের বুঝতে অসুবিধা হলো না। আগের দিন আব্বু ফুলের তোড়া নিয়ে আসবেন। পরদিন সকালে সবারই শহিদ মিনারে যাওয়া হবে। গাড়িতে সারাপথ সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হবে— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। শহিদ মিনারের কাছাকাছি গিয়ে এক জায়গায় থামতে হবে। এরপর হেঁটে হেঁটে গিয়ে একটি পরিবারের পক্ষ থেকে শহিদ মিনারে ফুল দেওয়া হবে। এই পরিবারের রক্তও মিশে আছে শহিদ মিনারে। কেননা, দাদুর বাবা একটু হলেও রক্ত দিয়েছিলেন। তাঁর গায়ে অবশ্য গুলি লাগেনি। দৌড়াতে গিয়ে তিনি একটি ইটের সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। আঘাতে পায়ের বুড়ো আঙুল কেটে প্রচুর রক্ত ঝরেছিল। পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলেন মাজায়। দাদু এই গল্পটি যখন করেন তখনই কাঁদেন। ফারিন জিজ্ঞেস করলে বলেন, তাঁর বাবার জন্য তিনি কাঁদছেন না। কাঁদছেন অত্যাচারীদের কথা মনে করে। ফারিন বলল, দাদু, এবার একটু অন্যরকম করলে কেমন হয়?

দাদু বললেন, অন্যরকম মানে?

ফারিন তর্জনী তুলে ‘এক মিনিট’ বলে দৌড়ে আম্মুর কাছে গেল। অনুরোধ করে নিয়ে এল আম্মুর মোবাইল ফোন। মেয়েটা দাদুর সাথে কী খেলা খেলছে, দেখতে আম্মুও ওর পেছন-পেছন এলেন। ফারিন মোবাইল ফোনটি হাতে রেখে, ফোনের সাথে লাগানো এয়ারফোন নিয়ে লাগিয়ে দিল দাদুর কানে। দাদু বললেন, এটা কী করছ দাদুভাই?

:দেখোই না মজা। তোমার ফোনটা তো আবার অ্যানালগ!

:তাতে কী? অ্যানালগ দিয়েও কত কথা বলা যায়, শোনা যায়।

দাদুর কথা শোনার ধৈর্য নেই ফারিনের। স্ক্রিনে টাচ করে ছেড়ে দিল গানটি—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...’। দাদু তখন তারিন ও ফারিনকে আদর করতে করতে গান শুনতে লাগলেন মন দিয়ে। তিনজনের তামাশা দেখে আম্মু হাসতে থাকেন।

গান শোনা শেষ করে দাদু এয়ার ফোন খুলে ফারিনের হাতে দেন। আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলেন, বউমা, দেখেছ তোমার মেয়ের কাণ্ড। সারাক্ষণ আমাকে হাসিখুশি রাখতে চায়।

আম্মু বললেন, ফারিন তো আপনাকে খুব পছন্দ করে, বাবা। আপনার কষ্ট থাকবে কেন? আপনি তো ওকে সবই শিখিয়েছেন। কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে মা-বাবাকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে শিক্ষককে ভালোবাসতে হয়। বলেছেন একুশে ফেব্রুয়ারির কথা, বলেছেন স্বাধীনতার কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা।

ফারিন বলে উঠল, আরো অনেক কথা বাকি রয়ে গেছে, আম্মু।

আম্মু ও দাদু দুজনেই ফারিনের দিকে তাকান। কী কথা বাকি রয়ে গেল? ফারিন মিষ্টি হেসে বলল, দাদুর বাবা ছিলেন ভাষা সৈনিক। সৈনিক হতে কী যোগ্যতা লাগে? আমিও সৈনিক হব।

দাদু একবার আম্মুর দিকে তাকান, একবার ফারিনের দিকে। আম্মু কী যেন বলতে গিয়ে থেমে যান। দুজনের কারো মুখেই কথা নেই। ফারিন আবারও বলে, আমি সৈনিক হব। তখন দাদু বললেন, ভাষার জন্যে তো আর সৈনিক হবার দরকার নেই, দিদিভাই। আমাদের শহিদ দিবস এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে।

তারপরও ফারিন অন্য কোনো উত্তরের অপেক্ষায় থাকে। হয়তো দেশের প্রতি ওর ভালোবাসা বাড়তে থাকে।