বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি নাম—যে নাম উচ্চারণ করা মাত্রই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দান, ভেসে ওঠে—ঊর্ধ্বে তুলে ধরা তাঁর তর্জনী। কানে ভেসে আসে বজ্রকণ্ঠের সেই উচ্চারণ—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি আমাদের বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি আমাদের জাতির পিতা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুত্ফর রহমান এবং মা শেখ সায়েরা খাতুন। চার কন্যা এবং দুই পুত্রসন্তানের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। তাঁকে পিতা-মাতা আদর করে খোকা বলে ডাকতেন। টুঙ্গিপাড়ার সেই সবুজ শ্যামল গ্রামে হেসে খেলে বেড়ে ওঠেন বাবা-মায়ের আদরের খোকা। শুধু বাবা-মা নন, গ্রামের প্রতিটি মানুষের অতি প্রিয় ছিলেন তিনি। প্রিয় ছিলেন শিক্ষক ও বন্ধুদের কাছে।
শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। তাঁর প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। বন্ধুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অফুরান। মানুষের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হতেন তিনি। পাশে দাঁড়াতেন সাধ্যমতো।
একদিন শীতে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাত্ দেখেন, এক বৃদ্ধ শীতে কষ্ট পাচ্ছেন। তখন তিনি নিজের গায়ের চাদর দিয়ে ঐ ব্যক্তির শীত নিবারণ করেন। এক বৃষ্টিমুখর দিনে তিনি নিজের ছাতা বন্ধুকে দিয়ে ভিজে ভিজে বাড়ি ফেরেন। কারণ, ছেলেটি রোজ ভিজে স্কুলে যেত। ছোটকাল থেকেই তিনি এমন মহানুভব ছিলেন। একদিন এক বন্ধুর ঘরে খাবার না থাকায় তিনি বাড়ি ফিরে মাকে সব খুলে বলেন। তারপর চাল নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে দিয়ে আসেন। তাঁর শিশুমনের এই মমতা আমাদের হূদয়কে স্পর্শ করে।
আমাদের জাতির পিতা শৈশব থেকেই ছিলেন আদর্শ মানুষ। তিনি একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর মনটা ছিল খুব নরম ও কোমল। তিনি শিশুদের খুবই স্নেহ করতেন। শিশুদের সাথে সময় কাটাতে খুব পছন্দ করতেন। একজন বিশ্বমানের নেতার মনে যেন এক ছোট্ট শিশু বাস করত। শিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুয়ার ছিল সব সময় খোলা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি শিশুদের কাছে পেলে খুবই আনন্দিত হতেন। তাদের সাথে গল্প করতে পছন্দ করতেন। শিশুদের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা নজিরবিহীন।
জাতির পিতার এই শিশুপ্রেমের কারণে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের তত্কালীন মন্ত্রিসভায় ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ থেকে দিনটি সরকারিভাবে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু নাকি প্রায় অনুষ্ঠানেই বলতেন, ‘শিশু হও, শিশুর মতো হও। শিশুর মতো হাসতে শেখো। দুনিয়ার ভালোবাসা পাবে।’
১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ পালনের উদ্দেশ্য হলো—শিশু-কিশোরদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা এবং তাদের সুকুমার বৃত্তিগুলোর বিকাশ সাধনের মাধ্যমে উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ রচনা করা। এই দিনটিতে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়। এসব আয়োজনের মধ্যে থাকে চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, নাচ, গান, কুইজ, রচনা প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। শিশুদের জন্য নানারকম প্রতিযোগিতার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করা হয় এবং তাদের সৃজনশীলতাকে অনুপ্রাণিত করা হয়। এই আয়োজনের ফলে শিশুরা বাঙালি জাতির মহানায়কের ইতিহাস জানতে পারে। জানতে পারে কীভাবে ধাপে ধাপে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীন হয়েছে।
বাঙালি জাতির এই মহানায়কের জন্মদিনে তাঁকে ভালোবেসে শিশু দিবস পালন খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু যেন এই শিশুদের মাঝেই বেঁচে আছেন তিনি। বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।