ফিহার আজ বিচ্ছিরি রকমের মন খারাপ। মন খারাপ হবে নাই বা কেন? এতদিনের পরিকল্পনা মুহূর্তেই শেষ। বাবা আজ অফিস থেকে এসে পরিষ্কার জানিয়ে দিল—এবার দাদুবাড়ি ঈদ করা হবে না। ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়নি।
অথচ ফিহা কতকিছু ভেবে রেখেছে। প্রতিবারের মতো এবারও দাদুবাড়ি যাবে। দাদুবাড়ির শানবাঁধানো পুকুরঘাটে গোসল করবে। খোলা মাঠে হাঁটবে। দাদাভাইয়ের বিশাল সবজি বাগানে নিজ হাতে সবজি তুলবে। রাতে ছাদে পাটি বিছিয়ে জোছনা দেখবে আর দাদুর কোলে মাথা রেখে ভূতের গল্প শুনবে।
ফিহার সবচেয়ে ভালো লাগে দাদুর আদর আর তার হাতের রান্না। আহা কী সুস্বাদু! ফিহার ধারণা, তার দাদুর মতো পৃথিবীর কেউ রান্না করতে পারে না। দাদুকে জড়িয়ে ধরে রাতে ঘুমানোর মজাই আলাদা। দাদু ফিহার না ঘুমানো পর্যন্ত চুলে বিলি কেটে দেয় আর গুনগুনিয়ে গান করে। এই সময়টা ফিহার ভীষণ পছন্দের সময়। এ সময়ের কথাটা মনে পড়তেই তার আর কিছুই ভালো লাগে না।
ফিহা, তোমার মন খারাপ?
ফিহা ভাবছিল দাদুবাড়ির কথা। কখন যে বাবা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি সে। বাবার প্রশ্নে বুকের ভেতর থেকে অশান্ত স্রোতের মতো কান্না বের হয়ে আসে। বাবার বুকে মাথা রাখে ফিহা।
বাবা, বলো মন খারাপ হবে না? বছরে মাত্র দুইবার দাদুবাড়ি যাই। এবার তাও হবে না। ঈদ করতে হবে এই শহরে। শহরে ঈদ করার কোনো মানে হয়? না আছে পুকুর, না আছে গাছপালা, না আছে আমার দাদা-দাদু। রাতে বিদ্যুতের আলোতে চাঁদের জোছনাও কেমন ফিকে লাগে।
বুঝতে পেরেছি আমাদের ফিহামনির খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ফিহামনি কি জানে তার বাবারও মন খুব খারাপ?
ফিহা বাবাকে আরো জোরে আঁকড়ে ধরে। সে বাবার বুকের কম্পন টের পায়। ফিহা বুঝতে পারে তার বাবাও কাঁদছে।
এরই মধ্যে ফিহার মাও এসে হাজির হয়। ফিহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, মন খারাপ করে না মামনি, তৈরি হয়ে নাও। আজ অনেক কেনাকাটা রয়েছে। তোমার ঈদের জামা, দাদা-দাদুর কাপড়-চোপড়, আরো কত্ত কী।
সত্যি মা, আজ আমরা কেনাকাটা করতে যাব?
অবশ্যই। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।
মায়ের কথায় ফিহা দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। মা-বাবার সঙ্গে যায় মার্কেটে। ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় ওদের।
মা, দাদা-দাদুর জন্য যে এত কিছু কিনলে, এগুলো পাঠাবে কী করে?
ফিহা জানতে চায়।
ঈদের পরে গিয়ে দিয়ে আসব। তখন তো টিকিট থাকবে।
সত্যি মা, আমরা দাদুবাড়ি যাব ঈদের পরে?
অবশ্যই যাব। আমার ফিহামায়ের দাদুবাড়ি যেতে ভালো লাগে আর আমি নিয়ে যাব না—এটা কি হতে পারে?
তুমি খুব ভালো মা।
ফিহা পরম আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরে।
আগামীকাল ঈদ। ফিহার মন মোটেও ভালো নেই। দাদুবাড়ি যেতে পারল না তাই। এতদিন মনে মনে ভাবছিল হয়তো কোনো মিরাকল হবে। তারা হয়তো যেতে পারবে। কিন্তু তার আর সময় কই?
ফিহা মা, ছাদে পাটিটা বিছিয়ে রাখো। একটু পরই আকাশে চাঁদ উঠবে।
পাটি বিছিয়ে কী হবে?
কেন আমরা চাঁদ দেখব, গান করব, আনন্দ করব।
মায়ের কথায় মনে মনে রাগ হয় ফিহার। দাদা নেই, দাদু নেই, আনন্দ করে।
এটা কোনো আনন্দ হলো।
মন খারাপ হলেও ফিহা একটি শীতল পাটি ছাদে নিয়ে সুন্দর করে বিছিয়ে রাখে।
সন্ধ্যা হতে দেরি নেই। মা কাজে ব্যস্ত। হঠাত্ দরজায় কলিংবেলের শব্দ।
দেখো তো ফিহা, কে এল?
মায়ের কথায় ফিহা দৌড় দিয়ে দরজা খুলে তো অবাক! দাদা-দাদু দুজনেই দরজার সামনে। ফিহা দাদুকে জড়িয়ে ধরে। ফিহার ঈদের খুশি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়।
দাদা-দাদু তোমরা?
হ্যাঁ আমরা। আমরা কি ফিহামনিকে রেখে ঈদ করতে পারি?
আকাশ আলোকিত করে ঈদের চাঁদ উঠেছে। ফিহাদের বাসার সবাই ছাদে বসে আছে। ফিহা শুয়ে আছে দাদুর কোলে মাথা রেখে।
দাদু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ফিহার ঘুম এসে যায়। কিন্তু সে ঘুমাতে চাচ্ছে না। সে আরো বেশি করে দাদুর আদর পেতে চায়। চাঁদ রাতে এটাই তার বাড়তি পাওনা।