বাঘায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের ঈদমেলা

ঈদ মানে আনন্দ। তার সঙ্গে বাড়তি উৎসব ঈদ মেলা। তবে এ মেলা দেশের সব স্থানে হয় না। এদিক থেকে প্রায় ৫শ বছর যাবত ঐতিহ্য ধারণ করে চলেছে রাজশাহীর বাঘাবাসী। ঈদের দিন থেকে শুরু হয় এ মেলা। চলে প্রায় মাস ব্যাপী। মাঝখানে করোনা মহামারির কারণে তিন বছর এবং রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে প্রায় এক বছর এ মেলাটি বন্ধ ছিল। তবে এবার স্থানীয় সংসদ সস্যের প্রচেষ্টায় নতুন করে এ মেলাটি শুরু হয়েছে। এর ফলে শুধু বাঘাবাসী নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষের মধ্যে ঈদ আনন্দের সঙ্গে বাড়তি আনন্দের খোরাক যোগাচ্ছে এখানকার ঈদমেলা। 

রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ও পুরাকৃতী সমৃদ্ধ উপজেলা হিসেবে প্রসিদ্ধ বাঘা উপজেলার ঈদ মেলার ঐতিহ্য প্রায় ৫শ বছরের। মূলত ঈদের ১০ দিন আগ থেকেই শুরু হয় মেলায় আয়োজন। প্রতি বছর মাজার পরিচালনা কমিটি এ মেলার দায়িত্ব বহন করে থাকেন।  মাত্র ১৫ দিনের জন্য এ মেলাটি ইজারা প্রদান করা হলেও কোনো কোনো বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে এ মেলার স্থায়ীত্ব আরো বেড়ে যায়। প্রতি বছরের মত এবারও মেলার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। এবার মাজার কর্তৃপক্ষ এ মেলাটি ইজারা দিয়েছেন ২৮ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। আর এটি পেয়েছেন পৌর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসেন।

Bagha Mala-01

ইতিহাস থেকে জানা যায়, আব্বাসীয় বংশের হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (রাহ) ও তার ছেলে হযরত আবদুল হামিদ দানিসমন্দ (রাহ) এর সাধনার পীঠস্থান রাজশাহীর বাঘা। আধ্যাত্মিক এ দরবেশের ওফাত দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর ঈদ-উল-ফিতরে আরবি শওয়াল মাসের ৩ তারিখে ধর্মীয় ওরস মোবারক উৎসবকে সামনে রেখে বাঘা ওয়াকফ এস্টেটের উদ্যোগে বিশাল এলাকা জুড়ে আয়োজন করা হয় এই ঈদ মেলা। যার কমতি  নেই এবারও। এ মেলায় দুরদূরান্ত থেকে ঘুরতে আসেন আবাল বৃদ্ধ-বণিতা। মেলাকে ঘিরে আয়োজন করা হয়, সার্কাস, নাগরদোলা, রাডার, মৃত্যুকূপ মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার খেলা ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন খেলাধূলারও আয়োজন করা হয়। 

এবারও একই নিয়মে সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। বসেছে হরেক রকম মিষ্টির দোকান। শুধু তাই নয়, মেলা প্রাঙ্গণে ওরস মোবারককে ঘিরে সারারাত ধরে মাজার এলঅকায় চলে ভক্তদের জিকির ও সামা কাওয়ালি। 

Bagha Mala-02

বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিন-পূর্ব সীমান্ত ঘেঁষা মানুষ গুলোর আনন্দ বাঘার ঈদমেলাকে ঘিরে। তাই এই মেলা এখানকার মানুষের কাছে অনেক অবেগ এবং গভীর আগ্রহের। পুরনো স্মৃতির পটভূমিতে নতুন করে আঁচর কাটে ঈদমেলা। বছর ঘুরে তাই এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকে সবাই। যাদের স্বজনরা সীমান্তের ওপারে থাকেন, তারাও বছরের নির্দিষ্ট এ সময়টা বেছে নেন একে-অপরের সঙ্গে দেখা করার। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাদের বসবাস তারাও ছুটে আসেন এ মেলায়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে পাপ মোচন ও পূণ্য লাভের আসায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ বাঘায় আসেন পবিত্র ওরস মোবারকে অংশ নিতে ও ঈদের দিন মাজার কর্তৃপক্ষের আয়োজনে  বিশাল জামাতে নামাজ আদায় করতে। 

Bagha Mala-04

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে এখানে ছিল উপমহাদেশের প্রথম ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, এছাড়াও মাজার শরীফের পাশে আছে বিশাল এক দিঘী। বাঘা শাহী মসজিদ এখানখার ঐতিহাসিক নিদর্শণ। এ মসজিদের ছবি রয়েছে দেশের ৫০ টাকার নোটে। ওরস ছাড়াও সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার মনবাসনা পূরণের জন্য হাজার হাজার দর্শনার্থীর আগমন ঘটে বাঘা শাহী মসজিদ ও মাজার শরিফ এলাকায়। 
বাঘা মাজার পরিচালনা কমিটির মত্তোয়াল্লী খন্দকার মুনসুরুল ইসলাম জানান, ঈদমেলার জৌলুস প্রতি বছরই বাড়ছে। বাড়ছে লোক সমাগমও। মূলত বছরের এই সময়টির জন্য এলাকার মানুষ অপেক্ষা থাকেন সারা বছর। মেলা দেখতে আসেন পর্যটকরাও। এতে লাখো মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।