বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন চান্দুমামা। গিট্টু বুঝে ফেলে চান্দুমামার মন খারাপ। বাসার সবাই ছাদে। সুযোগ বুঝে দৃশ্যমান হয় গিট্টু।
: আরে গিট্টু। কখন এলি?
: আপনার কি মন খারাপ মামা?
: বুঝলি কী করে বাপ?
: ভূত হলেও মন আছে তো মামা। আপনাকে দেখলেই আমি বুঝে যাই। এবার ঘটনা কী বলেন তো মামা।
: আর ঘটনা! বাজারে গেলেই আমার মন খারাপ হয় ভাগনে। দেখ এখন রমজান মাস চলছে। সারা পৃথিবীতে যেকোনো উত্সবের আগে জিনিসপত্রের দাম কমে। এখানে ঠিক উল্টো। জিনিসপত্রের দাম দিগুণ তিনগুণ হয়ে গেছে। চলব কীভাবে বল? সব বাদ দে। তরমুজ নিয়ে কী খেলা চলছে দেখ। সারাদেশে প্রচুর তরমুজের ফলন হয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে সস্তায় পিস হিসাবে তরমুজ কিনে শহরে এনে কেজি দরে বিক্রি করছে। তাও ষাট থেকে আশি টাকা কেজি। ব্যবসায় এইরকম অসততা আগে ছিল না রে। পঞ্চাশ টাকার তরমুজ হয়ে যাচ্ছে চারশ টাকা। ভাবা যায়? কিন্তু দেখার কেউ নেই। মৌসুমি ফল কিছু খারাপ মানুষের জন্য দেশের মানুষ মুখে তুলতে পারছে না। কষ্ট হয় না বল?
দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন চান্দুমামা।
গিট্টরও খুব মন খারাপ হয়। ও কী করতে পারে? ও ভাবে, যাদের এটা ঠিকঠাক রাখার কথা এরা কি তরমুজ খায় না? না কি ওরা ফ্রি খেতে পায়? মাথা গুলিয়ে যায় গিট্টুর।
২.
চান্দুমামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গিট্টু খিলক্ষেত বাজারে আসে। এক তরমুজ ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে পাইকারি বাজারের হদিস বের করে গিট্টু। বেশ ক’টি পাইকারি বাজার আছে ঢাকায়। তার মধ্যে বাদামতলি সদরঘাটের ফলের বাজার নামকরা। গিট্টু ভাবে, বাদামতলী যাবে ও। দেখবে ও ফল নিয়ে কারসাজিটা কে করে?
বাদামতলী, সদরঘাট। ফলের বাজারে ঢুকে মাথা খারাপ হয়ে যায় গিট্টুর। শত শত ফলের পাইকারি দোকান। নানা জাতের ফল নামছে ট্রাক থেকে। আমদানি করা আপেল, আঙুর, কমলা তো আছেই, আছে দেশি ফলও। এখন তরমুজের ভরা সিজন। ট্রাক থেকে তো নামছেই; বুড়িগঙ্গায় কার্গো ভর্তি তরমুজ আর তরমুজ। একটা বড় আড়তের পাশে দাঁড়িয়ে কাণ্ড দেখতে থাকে গিট্টু। এইমাত্র কার্গো ভিড়ল ঘাটে। আড়তের গদিতে বিশাল ভুঁড়িওয়ালা মহাজন বসে আছেন। কার্গো থেকে একটা লোক হাসতে হাসতে মহাজনের দিকে এগোচ্ছে। হাতে কিছু কাগজপত্র।
: বিরাট দাও মারছি বস। ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা পিস করে কিনেছি। কিন্তু দর হবে অন্তত আট থেকে দশগুণ। খুশি তো বস?
মহাজনের মুখে দারুণ হাসি।
৩.
মহাজনের কাছে এসে গদিতে বসে গিট্টু। ছোট একটা অপারেশন হোক আজ। অন্তত শুরু তো হোক।
: তরমুজ কাকা, একটা কথা বলি আপনাকে।
: তুই কেঠা? আর আমি তোর তরমুজ কাকা হই কেমনে?
: বাদ দেন কাকা। আসল কথাটা কই। যে দামে তরমুজ আপনি কিনেছেন, তার সাথে খরচপাতি আর শতকরা দশ টাকা লাভ ধরে তরমুজ বেচবেন। সেটা পিস হিসাবে হোক আর কেজি হিসাবেই হোক। বুঝতে পারছেন?
কোনো চিল্লা ফাল্লা করবেন না। আমি কিন্তু মানুষ না। আমি এখানেই থাকব। কিন্তু আপনি আমাকে দেখবেন না। দেখবেন মাঝে মাঝে একটা তরমুজ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কোনো ফাঁকিবাজি নয় কাকা। কোনো বেচাল দেখলেই সব তরমুজ বিনা পয়সায় মানুষের হাতে চলে যাবে। তো হিসাব কইরা ফেলেন। আমি আছি।
ফুস করে অদৃশ্য হয়ে যায় গিট্টু।
মহাজন দেখেন, গদির পাশের তরমুজের স্তূপটার কাছে একটা তরমুজ বাতাসে ভাসছে।