টেবিল ফ্যান

সবুজরা তিন ভাইবোন। কড়ি, সবুজ, পাতা। কড়ি সবার ছোট। পাতা মেঝো, সবুজ বড়। অত পয়সা নেই ওদের বাবার। সামান্য যা আয় করেন সংসার খরচে মিটে যায়। এর মধ্যেও চেষ্টা করেন ছেলেমেয়েদের শখ, আহ্লাদ পূরণ করার।

একবার সবুজের খুব শখ হলো সমুদ্র দেখার, বাবার অত টাকা কই ওদের সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবেন! তাই বলে শখ অপূর্ণ থাকবে! মোটেই না। এক গ্রাম পরেই একটা নদী আছে। সবাইকে নদী দেখাতে নিয়ে গেলেন বাবা। ওদের সাথে নদীতে নামলেন। সাঁতার কাটলেন, ডুব ডুব খেললেন। ফেরার সময় সদ্য ঘাটে ফেরা মাছ ধরার টলার থেকে একটা তাজা মাছ কিনলেন। বাড়ি ফিরে নিজেই কাটলেন সেই মাছ, নিজের হাতে রান্না করে ছেলেমেয়েদের মুখে তুলে খাইয়ে দিলেন। বাবার অমন কাণ্ডকীর্তিতে সেদিন ওরা সমুদ্র দেখার থেকেও বেশি আনন্দ পেয়েছিল।

গ্রামের আর দশটা ছেলে-মেয়ের মতো অত জামাকাপড় নেই ওদের, কিন্তু আছে। কেনা কোনো খেলনা নেই বটে, খেলনা ছাড়াও কী করে খেলতে হয় জানা আছে। বাবাই শিখিয়েছেন এভাবে। বাড়ির উঠোনে ওরা কত কী খেলে! দাড়িয়াবান্ধা, বউচি, গোল্লাছুট। ঘরের আনাচেকানাচেও খেলে। লুকোচুরি খেলা। বিছানায় বালিশ নিয়ে খেলে। ওরা সেই খেলার নাম রেখেছে বালিশ বালিশ খেলা। বাবা শিখিয়েছেন কেনা খেলনার অভাবে খেলা বন্ধ রাখতে নেই। খেলতে জানলে যেকোনো কিছুকে খেলনা বানিয়ে খেলা যায়।

পাতার একবার ইচ্ছে হলো একটা বিদেশি কুকুর পালার। কুকুরটার নাম রাখবে ‘চকলেট’। চকলেটের সাথে রোজ খেলবে সে। বিদেশি কুকুর কিনে দেওয়ার মতো পয়সা বাবার নেই। তাই বলে মেয়ের শখ পূরণ হবে না! আলবাত হবে। একদিন বাড়ি ফিরে ছেলে-মেয়েদের চমকে দিলেন। বাবার কোলে ফুটফুটে কুকুরছানা দেখে পাতা উল্লাসে ফেটে পড়ল। চিত্কার দিয়ে বলল, ‘চকলেট!’

বাবা বললেন, ‘না রে মা, ওর নাম লজেন্স। দেশি কুকুর তো তাই লজেন্স।’

বাবার কথা শুনে কড়ি খুব হেসেছিল। সেই থেকে লজেন্সও বাড়ির সদস্য। ওদের সাথে খায়, ঘুমায়, খেলে। লজেন্স এখন বড় হয়েছে। কড়িকে স্কুলে পৌঁছে দিতে বাবার সাথে সেও যায়। মাঝেমধ্যে কড়িকে স্কুল থেকে আনতেও যায়।

ক’দিন ধরে ভীষণ গরম পড়েছে। বাড়ির একটা মাত্র সিলিং ফ্যানে গরম কাটছে না কারো। গরমে লজেন্সেরও কষ্ট হচ্ছে দেখে বাবার কাছে একটা টেবিল ফ্যানের বায়না করে কড়ি। হঠাত্ টেবিল ফ্যান কিনবেন অতগুলো টাকা এখন কই পাবেন বাবা? তাই বলে মেয়ের শখ অপূর্ণ রাখা চলবে না। বাবা একশো টাকায় একটা ছোট্ট চার্জার ফ্যান কিনে আনেন কড়ির জন্য। মেয়ের শখ পুরোপুরি পূরণ করতে না পেরে এবারই প্রথম বাবার মন খারাপ হয়। পাতা সেটা টের পেয়ে বাবার মন ভালো করে দিতে এক কাণ্ড করে বসল। চার্জার ফ্যানটা পড়ার টেবিলে রেখে বলল, ‘বাবা দেখো, তোমার কিনে আনা চার্জার ফ্যান টেবিল ফ্যান হয়ে গেছে।’

একটা ছোট্ট চার্জার ফ্যানকে কেমন করে টেবিল ফ্যান বানিয়ে সন্তানেরা গায়ে হাওয়া লাগাচ্ছে। এমন অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য বাবার মন সত্যি সত্যি ভালো করে দেয়। এত অভাব-অনটনেও সন্তানদের ধৈর্য, বিদ্যা, বুদ্ধিকে মনে হয়—সাত রাজার ধন।