একসময় সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম ছিল সংবাদপত্র। জনগণের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আদিকাল থেকে ইতিহাসের গতি নির্ধারণে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সংবাদপত্র বাস্তব প্রকাশের বাহন, মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার ঠিকানা। এমন সফল এক সংবাদপত্রের নাম ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। যে পত্রিকাকে প্রকাশের পর থেকে মাটি ও মানুষের পক্ষে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। বাংলা ও বাঙালির জীবন ইতিহাসের সঙ্গে ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া ও তার প্রতিষ্ঠিত ইত্তেফাক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানিক মিয়া সাংবাদিকতায় এই উপমহাদেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, জীবন্ত কিংবদন্তি, বিবেকী সাংবাদিকতার পথিকৃত, বরেন্দ্র কৃতিধন্য মানুষ ছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাক বাঙালির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা-চেতনা থেকেই ইত্তেফাক পাত্রিকার জন্ম। মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক, বাঙালির কথা বলার একমাত্র আশ্রয় ও ঠিকানা। মানিক মিয়া উপমহাদেশে প্রতিভাধর সাংবাকিদদের একজন। তিনি ছিলেন মনুষ্যত্বের সাধক ও চিন্তাবিদ।
১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় দৈনিক ইত্তেহাদ, নামক পত্রিকার সেক্রেটারি হন মানিক মিয়া। এই পত্রিকাকে করাচি থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করলে পাকিস্তান সরকার একাধিক বার বাধা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ হলে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশ বিভাগের পর থেকে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালিকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে ঐক্যের মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল ইত্তেফাক। পত্রিকাটি লড়েছে আপসহীন। স্বাধীনতার সব আন্দোলন-সংগ্রামকে বহুল প্রচার করেছে দৈনিক ইত্তেফাক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির সিংহপুরুষ, মানিক মিয়া ছিলেন সাংবাদিকতার সাহসী অগ্নিপুরুষ। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রায় দুই যুগ সময়ে ইত্তেফাক ছাড়া কোনো সংবাদপত্র পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়নি। মানিক মিয়া তার জীবনের সাধনার ফসল মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দেখে যেতে পারেননি।
রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পরিবর্তে বাংলা ভাষার দাবিতে সোচ্চার হলে পাকিস্তানমোহ ও পাকিস্তানপ্রীতি কমতে থাকে। একপর্যায়ে বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমির চেতনায় মুসলিম লীগবিরোধী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেই দুঃসময় ও দুর্দিনে এই দলের মুখপত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ঐতিহাসিক সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি ও ইয়ার আহমদকে প্রকাশক করে সে বছর ১৫ আগস্ট সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট মানিক মিয়া পত্রিকাটির পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সাপ্তাহিকের পরিবর্তে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ঘোষণা করে ২৫ ডিসেম্বর প্রকাশনার যাত্রা শুরু হয়। সম্পাদক মানিক মিয়ার কলমে ছিল বারুদ। তিনি ছদ্মনামে ‘মুসাফির’ ও ‘রাজনীতির মঞ্চ’ নামে দুঃসাহসিক কলাম লিখতেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের ভিত কেঁপে যায় তার লেখনীতে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ‘আমার মানিক ভাই’ শিরোনামে কলামও লিখতেন। মানিক মিয়া কোনো তোষামোদি, স্বার্থবাদী চিন্তা না করে পত্রিকাটির নিয়ম-নীতি, কোন ধরনের লেখায় জনস্বার্থ জড়িত, তা বিবেচনা করে প্রকৃতি ও চরিত্র নির্ধারণ করতেন। সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে মানিক মিয়া সংবাদপত্র জগতে পথ চলা শুরু করেছিলেন। ফলে বঙ্গবন্ধু হলেন বাঙালি জাতির পিতা এবং মানিক মিয়া হলেন সাংবাদিকদের কুলশিরোমণি। সোহরাওয়ার্দী দুই পথের দুই জনকে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের সবক শিখিয়েছিলেন এবং দুই জন সফলও হয়েছেন। বলা যায়, সোহরাওয়ার্দী এ দুই জনকে আগামীর নেতা তৈরি করেছিলেন।
পিরোজপুর জেলার বিখ্যাত ভাণ্ডারিয়া গ্রামে ১৯১১ সালে মানিক মিয়া জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবকালে মা মারা যান। নিজ গ্রামের ভাণ্ডারিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং ভাণ্ডারিয়া হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে পিরোজপুর হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৩ সালে বরিশাল বি এম কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। লেখাপড়া শেষে তিনি পিরোজপুর মহুকুমা কর্মকর্তার সহকারী ও বরিশাল জেলার গণসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। সিভিল কোর্টে চাকরি নেওয়ার পর মহান নেতা সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং চাকরি ছেড়ে কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার গোয়ালদী গ্রামের খন্দকার আবুল হোসেনের কন্যা মাজেদা বেগমকে বিয়ে করেন। তার দুই ছেলে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং দুই কন্যা ছিলেন। মানিক মিয়া বঙ্গবন্ধু, আতাউর রহমান খান, খন্দকার মো. ইলিয়াসের সঙ্গে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন সফর করেন। ১৯৬৩ সালে ইন্টান্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রচার শুরু হলে মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করে এক বছর জেলে রাখা হয়। ১৯৬৩ সালে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা বন্ধ ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করলে ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে পুনরায় প্রকাশনা শুরু হয় এবং মানিক মিয়া নিজ কলামে সামরিক সরকারের শক্তি বড় না, ইত্তেফাক পত্রিকার শক্তি কতুটুকু তা লিখে প্রমাণ করেন।
১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় ইত্তেফাকের শীর্ষ খবর ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখে দাঁড়াও’। স্বাধীনতার মুক্তি সনদ ৬ দফাকে সমর্থন ও বহুল প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল ইত্তেফাক। ৬ দফাকে সমর্থন করায় পাকিস্তান সরকার ইত্তেফাককে ‘পাকিস্তান বিভক্ত করার কাজে লিপ্ত’—এমন অভিযোগ এনে মানিক মিয়াকে গ্রেফতার এবং পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থাণে আইয়ুব খানের মার্শাল ‘ল’ জারির পর মানিক মিয়াকে কারাভোগ করতে হয়। ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে ইত্তেফাক পত্রিকাটির অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংবাদপত্র সমাজের অপরিহার্য অঙ্গ। আক্ষরিক অর্থে জনগণের সদা জাগ্রত সংসদ। সংবাদপত্র একটি সমাজের সামগ্রিক পরিচয়ের প্রাত্যহিক দলিল। সংবাদপত্র একটি রাষ্ট্রের জন্য তখনই গুরুত্বপূর্ণ, যদি তার প্রকাশক ও সাংবাদিকেরা সত্যনিষ্ঠ, সাহসী, গণমুখী ও দেশপ্রেমিক হন। সাংবাদিক ও কলামিস্টদের বিশ্বের চোখ ও কান বলা হয়। সেই অবস্থান থেকে দৈনিক ইত্তেফাক ছিল কান আর চোখ। পত্রিকাটি অনেক সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৃষ্টি করেছে, যা এই উপমহাদেশে নজিরবিহীন। এর মধ্যে হয়তো আমিও একজন।
এ দেশের মাটি ও মানুষের জন্য দীর্ঘজীবন সংগ্রামের পর ১৯৬৯ সালের ২৬ মে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে যান এবং ১ জুন রাতে ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মানিক মিয়া ৫৮ বছর বয়সে (১৯১১-১৯৬৯) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মরদেহ ঢাকার আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ বাঙালির হূিপণ্ড মানিক মিয়ার নামেই নামকরণ করা হয়।
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক