একাত্তর পেরিয়ে সৌরভে-গৌরবে ইত্তেফাক 

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৯:১৯

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের বিভাজন ঐতিহাসিক হলেও এটি সাম্প্রদায়িক শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়। বরং বিদ্বেষ গভীরতর হয় এবং পাকিস্তানের ভেতরেও বৈষম্য প্রকট হয়। বিশেষত পূর্ব বাংলার বাঙালিরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সাংস্কৃতিকভাবে শোষিত ও উপেক্ষিত ছিল। শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাদের বিরোধী অবস্থান গড়ে তোলে। একসময় পূর্ব বাংলার জনগণ উপলব্ধি করে, ধর্মভিত্তিক তত্ত্ব মুক্তি আনতে পারবে না। ভাষা আন্দোলন,  ৬-দফা এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালিরা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

এমনি এক জটিল প্রেক্ষাপটে ও অস্থির সময়, ১৯৫৩ সালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং ইয়ার মোহাম্মদ খানের উদ্যোগে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। এটি ছিল এমন একটি সময়, যখন পূর্ব বাংলা-পাকিস্তানের মানুষ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় নিপতিত। ইত্তেফাক দ্রুতই পূর্ব বাংলার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে এবং জাতীয় আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, তার সাহসী ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তার নেতৃত্বে ইত্তেফাক বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। মানিক মিয়ার লেখনীতে রাজনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক শোষণ এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রশ্নগুলো স্থান পেত। তার কলাম ও সম্পাদকীয়গুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন চেতনার সঞ্চার করে, যা স্বাধীনতার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইত্তেফাকের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এটি ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালির জাতীয় চেতনা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে ১৯৫৫ সালে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ যখন নাম পরিবর্তন করে ‘আওয়ামী লীগ’ হয় এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে মনোযোগ দেয়, তখন ইত্তেফাক তাদের বার্তাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

ইত্তেফাক শুধু একটি সংবাদপত্র ছিল না, এটি ছিল একটি আন্দোলনের অংশ। এটি বাঙালির স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে জাগ্রত করে। মানিক মিয়ার মতো সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকা পত্রিকাটিকে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই সময় ইত্তেফাক ছিল গণমানুষের কণ্ঠস্বর এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের এক শক্তিশালী প্রতীক।

১৯৬৪ সালে ঢাকা ও পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির ওপর একটি গুরুতর আঘাত হানে। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাক দাঙ্গার বিরুদ্ধে দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান নেয়, যা পত্রিকাটির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আরো স্পষ্ট করে তোলে। বিশেষভাবে, ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে একটি কলাম সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এই সাহসী প্রচারণা বাঙালির মধ্যে ঐক্যের ভিত্তি আরো দৃঢ় করে এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ রুখতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। ইত্তেফাকের মতো একটি সংবাদপত্রের এই সক্রিয় ভূমিকায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের চেতনা আরো শক্তিশালী হয়, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

১৯৬৬ সালের ৬-দফা কর্মসূচি বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের মুক্তির সনদ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ৬-দফার প্রতি শুরু থেকেই বৈরী মনোভাব প্রদর্শন করে। এই সংকটময় সময় দৈনিক ইত্তেফাক এবং এর সম্পাদকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তত্কালীন সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সাহসিকতার সঙ্গে ৬-দফার পক্ষে অবস্থান নেন। ইত্তেফাকের নিবন্ধ এবং প্রতিবেদনগুলোতে ৬-দফার গুরুত্ব এবং এর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ৬-দফার প্রতি সমর্থন বাড়তে থাকে এবং এটি একটি গণআন্দোলনের রূপ পায়। ইত্তেফাকের এই নির্ভীক প্রচারণা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলস্বরূপ, সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয় এবং মানিক মিয়াকে কারাগারে পাঠায়। তবে এই দমন-পীড়নও বাঙালির চেতনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং ইত্তেফাকের অবস্থান এবং মানিক মিয়ার আত্মত্যাগ আরো বেশি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। ইত্তেফাক সেই সময় বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের এক অনন্য মাইলফলক হয়ে ওঠে।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে দৈনিক ইত্তেফাক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নির্বাচন ছিল বাঙালির জন্য তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ইত্তেফাক তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখে। পত্রিকাটি তার সাহসী লেখনী এবং প্রগতিশীল অবস্থানের মাধ্যমে জনমত গঠনে সহায়ক হয়, যা আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই বিজয়ই পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পথকে সুগম করে এবং মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন করে।

স্বাধীনতার পর দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংবাদপত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মুখপত্র না হয়ে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, এবং মানবাধিকারের প্রচারে ইত্তেফাক তার প্রতিবেদনে এবং সম্পাদকীয়তে নিরলস ভূমিকা পালন করে আসছে।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বিভিন্ন সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইত্তেফাক বরাবরই সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যখন দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখা দিয়েছে, পত্রিকাটি তার অসাম্প্রদায়িক আদর্শে অটল থেকে জনগণের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়েছে। বিশেষত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ।

দৈনিক ইত্তেফাক তার নীতিগত অবস্থান ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়ার সময় পত্রিকাটি সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করে। নারী ও শিশুর অধিকার নিয়ে জনমত গঠনে ইত্তেফাকের প্রতিবেদন এবং সম্পাদকীয় ধারাবাহিকভাবে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে। পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও ইত্তেফাক দেশবাসীকে সচেতন করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তার সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে ইত্তেফাক স্বাধীনতার আদর্শ ও গণমানুষের প্রত্যাশাকে ধারণ করে দেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে একটি অমূল্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

জাতীয় ইস্যুতে পক্ষপাতহীন ও সাহসী অবস্থান গ্রহণ করে এটি সব সময় দেশের কল্যাণে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ ও প্রচার করার ক্ষেত্রে ইত্তেফাক শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ইত্তেফাক জাতির ইতিহাস ও অর্জনকে উদ্যাপন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছে। পত্রিকাটি এ সময় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অজানা কাহিনি, সংগ্রামী মানুষের জীবন এবং ঐতিহাসিক দলিল তুলে ধরে দেশবাসীর মধ্যে ঐক্যের চেতনা জাগ্রত করতে সক্ষম হয়।

ইত্তেফাক শুধু একটি সংবাদপত্র নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক। এটি জাতীয় সংকটের সময় দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে।

গণতন্ত্রের সুরক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইত্তেফাক আজও জাতির পাশে রয়েছে। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর এবং জাতির উন্নয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করছে। ইত্তেফাকের প্রতি মানুষের এই আস্থা পত্রিকাটিকে জাতীয় জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ব্যর্থতা পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্মকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই রাষ্ট্র শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যপূর্ণ নীতির কারণে বাঙালির অধিকার ও সংস্কৃতিকে বারবার উপেক্ষা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইত্তেফাক এক সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় চেতনা, অধিকার ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। এটি কেবল একটি পত্রিকা নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। ইত্তেফাকের অতীত ভূমিকা যেমন জাতির প্রেরণা হয়ে রয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতেও এটি দেশের পক্ষে থেকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করবে—এটাই জাতির প্রত্যাশা।

লেখক: অধ্যাপক ও প্রাক্তন সভাপতি, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

ইত্তেফাক/এসএএস