খোকার ঈদ

কোরবানি ঈদের চাঁদ দেখে চঞ্চলের খুশির সীমা নেই। ঈদের আর কয়দিন বাকি আছে, চঞ্চল তা প্রতিনিয়ত গুনেই যাচ্ছে। তার অপেক্ষা যেন শেষ হয় না। ইতোমধ্যেই তার বাবা মজিদ সরকার চঞ্চলের জন্য ঈদের নতুন জামাকাপড় কিনে দিয়েছেন। চঞ্চল তার বন্ধু-বান্ধবদের ডেকে এনে প্রতিদিন নতুন পোশাকগুলো দেখায়। কেউ যদি বলে, বাহ্! তোমার পোশাক অসাধারণ হয়েছে। তাহলে তার খুশির সীমা থাকে না।

পাশের বাড়ির এক বয়স্ক মহিলা, যাকে চঞ্চলসহ তার বয়সী সকল ছেলেমেয়ে দিদা বলে ডাকে। চঞ্চল তাকে হাত ধরে নিয়ে আসে তার নতুন পোশাক দেখানোর জন্য। বুড়ি তো ঠিকমতো চোখেই দেখে না বয়সের ভারে। কিন্তু ছোট চঞ্চল তো আর এতকিছু বোঝে না। সে পোশাক বের করে বলে, ‘দিদা, আমার ঈদের পোশাক কেমন হয়েছে, দেখো তো?’ দিদা হাতে নেড়ে নেড়ে চঞ্চলের জিন্সের প্যান্ট দেখে বলে, ‘বেশ তো চঞ্চল, খুব মোটা আছে। শীতের মধ্যে আরাম হবে, শীত লাগবে না তোর।’ এরপর বুড়ি পাঞ্জাবি হাত দিয়ে ধরে বলে, ‘এটা খুব পাতলা, এটা পরলে শরীর দেখা যাবে।’

এসব শুনে চঞ্চলের মন একেবারে খারাপ হয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে তার মাকে বলে, ‘আমি এসব কিছুই পরব না মা। দিদা বলেছে একটি শীতের জন্য ভালো হবে, আর একটিতে শরীর দেখা যাবে। এমন পোশাক পরে বাইরে গেলে লোকে আমাকে পাগল বলবে। চঞ্চলের মা তো ভারি মুশকিলে পড়ে গেলেন! কী করে যে ছেলেকে বোঝাবেন। চঞ্চলের বাবা বাড়িতে ফিরলে চঞ্চলের মা তার বাবাকে বলেন, ‘কী যে জ্বালায় পড়লাম, তোমার ছেলে ঈদে নতুন পোশাক পরবে না।’ সে বলছে—একটি শীতের কাপড় আর একটি পড়লে শরীর দেখা যাবে। পাশের বাড়ির বুড়ি মাকে ডেকে এনে তোমার ছেলে সব পোশাক দেখিয়েছে। বুড়ি মা চঞ্চলকে এমন কথা বলেছেন। তাই তোমার ছেলে মন খারাপ করে বলে, এসব সে পরবে না। চঞ্চলের বাবা বলেন, বুড়ি মা’র আর দোষ কী? তিনি তো চোখেই ভালো দেখেন না। তাকে দেখিয়ে চঞ্চল জানতে চেয়েছে, বুড়িমা তো সত্যটাই বলেছেন। মোটা একটা আর একটা পাতলা। এখন তাকেও তো দোষ দিতে পারছি না।

চঞ্চলের বাবা মজিদ সরকার হেসে হেসে বলেন, একজন শিশু আর একজন বুড়ো! মানে মানুষ বুড়ো হলে শিশুর মতো হয়ে যান। তাই এই দুই শিশুর কথা বাদ দাও। এই বলে মজিদ সরকার পাশের বাড়ির গোলাপির মাকে ডেকে এনে ছেলের সামনে পোশাকগুলো বের করে দিয়ে বলেন, ‘দেখো তো গোলাপির মা, চঞ্চলের ঈদের পোশাকগুলো কেমন হয়েছে?’ গোলাপির মা দেখে বলে, ‘বাহ্ বাহ্, খুবই সুন্দর তো, চঞ্চলকে খুব মানাবে। এমন পোশাক আমিও আমার খোকার জন্য আজই কিনে নিয়ে আসব।’ এসব কথা শুনে চঞ্চল আনন্দে সব পোশাক আলমারিতে রেখে দেয়। ঈদের দিন সকালে গোসল করে নতুন পোশাক পরে খুশিতে তার মায়ের রান্না সেমাই-ফিরনি খেয়ে নামাজ পড়তে যায় বাবার সাথে।

নামাজ পড়ে এসে সবার সাথে চঞ্চল ও তার বাবা তাদের পোষা বড় খাসিটাকে কোরবানি করতে নিয়ে যায়। খাসিটা মজিদ সরকার খুব শখ করে পালন করেছিলেন কোরবানির জন্য। ছোট চঞ্চল খুব আদর করত খাসিটাকে। নিজের হাত দিয়ে খাওয়াত ধরে ধরে। আজ তাকে জবাই করতে দেখে ছোট চঞ্চলের চোখে পানি ঝরতে থাকে।