চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু, ‘নীরব’ চসিক!

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী বাড়তে শুরু করেছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অনেক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী চিকিত্সাধীন রয়েছে। চিকিত্সকরা জানান, কোনো ডেঙ্গু রোগী দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হলে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। গত তিন বছরের মধ্যে গত বছর এই রোগের প্রকোপ চরম আকার ধারণ করে। প্রতি বছর জুন থেকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মৌসুম শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গিয়ে সেটা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই প্রবণতা বিবেচনায় রেখেই মশা নিধনের জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু সিটি করপোরেশন এখনো মশা নিধনে বিশেষ কার্যক্রম শুরু করেনি। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে শঙ্কিত। সিভিল সার্জনের কার্যালয় ডেঙ্গুর প্রভাব মোকাবিলায় এখনই মশা নিধনসহ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে মশা নিধনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হবে। নগরবাসীর অভিযোগ, কেবল ডেঙ্গুর  প্রকোপ চরম আকার ধারণ করলেই সিটি করপোরেশন মশা নিধনের তোড়জোড় শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে ডেঙ্গুর আক্রমণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমলে তারা আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অথচ বছর জুড়ে মশা নিধনের কর্মসূচি চালু রাখলে কোনো ধরনের মশা এত পরিমাণে বৃদ্ধি পায় না। ফৌজদারহাট বিআইটিআইডির সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ বলেন, ডেঙ্গুর প্রজনন উত্স নিয়ে মানুষকে সচেতন হতে হবে। আক্রান্ত হলেই চিকিত্সকদের শরণাপন্ন হয়ে চিকিত্সা নিতে হবে।

জানা গেছে, চমেক হাসপাতালেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে তিন জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, এই মৌসুমে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যায়। আমরা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করেছি। ডেঙ্গু রোগীর  চিকিত্সার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষাসহ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অনেক আক্রান্ত রোগী বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়ে চিকিত্সা নিচ্ছে। বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে চার-পাঁচ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। তার আগে কয়েক জন চিকিত্সা নিয়ে চলে গেছেন। চিকিত্সকদের প্রাইভেট চেম্বারে গিয়েও রোগীরা চিকিত্সা নিচ্ছে।’

জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে আমাদের প্রস্তুতি ভালো। ২০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড আমরা কিনে রেখেছি। ৩ হাজার লিটার র-লার্ভিসাইড আছে। এক লিটার লার্ভিসাইড ৩ হাজার লিটার ওষুধে মিশিয়ে ব্যবহার সম্ভব। সুতরাং ওষুধের কোনো ঘাটতি এবার হবে না। অ্যাডাল্টিসাইডের সঙ্গে ভেষজ মসকুবার মিশিয়ে মশা নিধনে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে সুফল মিলছে। জানা গেছে, চসিক ছাড়া দেশের অন্য কোনো সিটি করপোরেশন মসকুবার ব্যবহার করছে না। 

গত বছর চসিক এটি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করেছিল। চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি কারখানা থেকে এ ওষুধ সংগ্রহ করা হয়। তবে পাবলিক হেলথ প্রকিউরমেন্ট (পিএইচপি) এ ওষুধ বাজারজাতের অনুমোদন এখনো দেয়নি, কেবল সায়েন্স ল্যাব অনুমোদন দিয়েছে। এক্ষেত্রে মসকুবার ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আপত্তি দেবে কি না, এ প্রশ্নও উঠছে। জানতে চাইলে চসিকের মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী বলেন, ‘সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগযোগ রাখছি। আগামী জুলাই মাসের প্রধম সপ্তাহ থেকে মশা নিধনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হবে। একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে চট্টগ্রামের ৬০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর আবাসস্থল পাঁচটি এলাকায়। বাকলিয়া, চকবাজার, কোতোয়ালি, ডবলমুরিং ও বায়েজিদ বোস্তামি। এসব এলাকাকে গবেষকেরা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেন।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরী বলেন, গত তিন বছরের পরিস্থিতি বিবেচনায় জুন মাসের শুরু থেকে আমরা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মৌসুম শুরু হিসেবে নিয়েছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আমাদের এ বিষয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দিয়েছে। আমরা উপজেলা পর্যায়ে সব সরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগী গেলে চিকিত্সা যেন দেওয়া যায়, সে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।