নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে তৈরি করা মূল্যায়ন পদ্ধতি ও প্রশ্নে প্রথম বারের মতো পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এই মূল্যায়ন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। তবে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা যেসব কারণ ও যেভাবে অভিযোগ তুলেছিলেন, ঠিক একইভাবে এই শিক্ষাক্রমের আলোকে মূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষক সংখ্যাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় এনে এই শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়নের তাগিদ অভিভাবক ও শিক্ষকদের।
নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী এই সামষ্টিক মূল্যায়নের লিখিত অংশের ওয়েটেজ ছিল ৬৫ শতাংশ। আর কার্যক্রম ভিত্তিক অংশের ওয়েটেজ ছিল ৩৫ শতাংশ। আর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কার্যক্রম বলতে বোঝানো হয়েছে হাতে-কলমে কাজ।
আমিরুল ইসলাম নামে একজন শিক্ষক বলেছেন, সারা দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় এবার প্রশ্ন দেওয়া হচ্ছে একযোগে। পরীক্ষা নিতে গিয়ে বিস্মিত হলাম। শিক্ষার্থীরা জানাল, রাতেই তারা ইউটিউবে প্রশ্ন, উত্তর সব পেয়ে গেছে। শিক্ষা উপকরণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের বই আনতে বলা হয়েছে। বই খুলে গল্পগুজব করে, হেসেখেলে বাচ্চারা পরীক্ষা দিল।
একাধিক শিক্ষক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে এটা সত্য। তবে এ ধরনের মূল্যায়ন থাকলে শিক্ষার্থীরা আর পড়ার টেবিলে বসবে না। কারণ শিক্ষার্থীরা বুঝে গিয়েছে এই পরীক্ষার জন্য পাঠ্যবই পড়ার প্রয়োজন নেই। শহীদুল হাসান নামে একজন অভিভাবক বলেছেন, ‘আমার সন্তান সিলেবাস অনুসারে প্রিপারেশন নিয়ে গিয়েছিল। এমন পরীক্ষা দেখে সে আর পড়তে চাইবে না।’
ফারহানা হায়দার নামে এক অভিভাবক সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, আসলেই এটা উত্সব ছিল। কোন পরীক্ষা ছিল না। আমার মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষা দিয়ে এসে বলেছে, ‘আম্মু তুমি শুধুই টেনশন কর। দেখ কি প্রশ্ন আসছে। এতে তো কোন পড়াই লাগে না। এমনিতেই পারি। এগুলো বইয়েও নেই।’
এই অভিভাবক বলছেন, আমার মেয়ের ধারণা জন্মেছে যে—এমনিতেই পারা যায়। জানিয়েছে, সে আর পড়ার জন্য টেবিলে বসবে না।
আরিফুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে প্রজেক্ট দেওয়া হয়। কিন্তু একটি শ্রেণিতে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলে কীভাবে সম্ভব। গ্রামে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকায় সেখানে সম্ভব হলে মহানগরীতে সম্ভব নয়। কারণে এখানে প্রতিটি শ্রেণিতে ৬০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকে।
আলাউদ্দিন ভুঁইয়া নামে একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, ষাণ্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়নে ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন পর্যবেক্ষক রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের বিদ্যালয়ে ৪০ জন দরকার। শিক্ষক আছেন মাত্র ১৮ জন। বিষয় শিক্ষক দুই শাখায় আট জন। বাকিজনদের পাব কোথায়?
ঢাকার একজন প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, অনেকেই পর্যবেক্ষক সংকটে পড়বে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, যে কোনো একটি বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে দুই থেকে তিন জন শিক্ষক থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এতে প্রকৃত মূল্যায়ন হবে না।
গতকাল দুপুর থেকেই বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে এই মূল্যায়ন নিয়ে অভিভাবকরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। শিক্ষকরা বলছেন, কারিকুলামের সমালোচনা করে বেশ কয়েক জন অভিভাবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। জেল হাজত খেটেছেন। আর শিক্ষকরা এই মূল্যায়ন নিয়ে মতামত দিলে চাকরি হারানোর পাশাপাশি জেল হাজতে যেতে পারেন। তাই এ বিষয়ে কোনো মতামত দেওয়া যাবে না। তবে নাম পরিচয় গোপন করে অনেক শিক্ষক এই প্রতিবেদকের কাছে মূল্যায়ন নিয়ে তাদের মতামত দিয়েছেন।
ঢাকার একটি নামি স্কুলের এক শিক্ষক বলেছেন, পরীক্ষার চাপ কমাতে গিয়ে, তিন ঘণ্টার পরীক্ষা পাঁচ ঘণ্টা হয়ে গেল। এতে তো চাপ বাড়ল। এছাড়া পাঁচ ঘণ্টার মূল্যায়ন কার্যক্রম অনেক শিক্ষার্থীদের ১ থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। পরে ঐসব শিক্ষার্থীদের তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা অযথা বসিয়ে রাখা হচ্ছে। তিনি পরীক্ষার সময় কমিয়ে আনার দাবি জানান।
শিক্ষকরা বলছেন, মহানগরীর শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জোড়াতালি দিয়ে হলেও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে।
অন্যদিকে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই আগের রাতে এ মূল্যায়নের নির্দেশিকা বা প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও ইউটিউবে প্রশ্নপত্রের আলোকে সমাধানও দেওয়া হয়েছে। স্কুলে গিয়ে শুধু সেগুলো করে দিয়ে বা লিখে দিয়ে এসেছে তারা। শিক্ষকরা বলছেন, এটা পরীক্ষায় অনেকটা নকল করার মতোই। এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র শুধু প্রতিষ্ঠান প্রধান পরীক্ষার আগের দিন ডাউনলোড করতে পারছেন।
তবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গতকাল একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, নতুন শিক্ষাক্রমে যেহেতু পরীক্ষা পদ্ধতিতে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই এখানে প্রশ্নফাঁসের কোনো সুযোগ নেই।
মন্ত্রী বলেন, এটা পাবলিক পরীক্ষা নয়, এটা শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পরীক্ষা। সেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থী প্রকাশ করবে তার শিখনফলটি ও লাইন আউটকাম অর্জিত হয়েছে কি না। নওফেল আরও বলেন, এখানে প্রমাণ করার বিষয় নেই, মেধা প্রমাণের বিষয় নেই, শিক্ষক দেখবেন শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জিত হয়েছে কি না। সুতরাং প্রশ্নফাঁস করলেও সেটির কোনো উপকারিতা নেই। একজন শিক্ষার্থীকে অবশ্যই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে পারদর্শিতার স্তর অতিক্রম করতে হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চলতি বছর দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে এ প্রক্রিয়া চালু হবে।