জাতির উদ্দেশ্যে রোববার সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনুস। সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেওয়ার ১৭ দিন পর তিনি এই ভাষণ দিলেন। সাধারণত পূর্ববর্তী রেওয়াজ অনুযায়ী অনেকটা বিলম্বেই তিনি এই ভাষণ দিলেন। এর আগে যারা সরকার প্রধান হয়েছেন তারা খুব দ্রুততায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন। ফলে আমরা অনেকেই আশা করেছিলাম যে, তিনি হয়তো শপথ নেওয়ার দুই একদিনের মধ্যেই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন।
যে অবস্থার মধ্যে তিনি সরকার গঠন করেছেন, একটা বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, আইন-শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভঙ্গুর, পুলিশ, সিভিল প্রশাসন, আদালত সর্বক্ষেত্রেই একটা নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা দিনরাত পরিশ্রম করে মাঠে পাহারা দিয়ে, ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাণপন চেষ্টা করছে। ফলে অনেকের ধারণা ছিলো যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস দ্রুতই জাতির উদ্দেশ্যে একটা দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবেন।
যদিও আমরা জানি, বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে কাজের কাজ খুব একটা হয় না। অবশেষে তিনি বহুল প্রতীক্ষিত ভাষণ দিলেন। তার এই ভাষণ দেওয়ার পরপরই বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে একটা ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। সর্বত্রই ভাষণের প্রশংসা চলছে। নেট দুনিয়ায় তুমুল প্রশংসা। লোকেরা বলাবলি করছে যে, বহুদিন পর জাতির উদ্দেশ্যে এরকম সামগ্রিক সারগর্ভমূলক একটা ভাষণ দেওয়া হয়েছে। যেই ভাষণে আমিত্বের বদলে আমরার কথা আছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যায়, কেন তিনি জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে সময় নিলেন, জনপ্রিয়তার সস্তা পথে না হেঁটে তিনি রাষ্ট্রের ক্ষতগুলো খুঁজে বের করে তার সরকারের করণীয় ঠিক করে নিয়েছেন, কোথায় তাকে কাজ করতে হবে, ঠিক কোন কোন সেক্টরে সংস্কার করতে হবে এ বিষয়ে তিনি ও তার টিম বেশ হোমওয়ার্ক করেছেন বলে মনে হলো। ফলে, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে তার সময়ের প্রয়োজন ছিল। তিনি যথার্থভাবেই খুঁজে বের করেছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমস্যা, পুলিশ বাহিনীর অস্থিরতা, গুম খুনসহ রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চরিত্র, আদালত অঙ্গণের নৈরাজ্য, চিকিৎসা খাত, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, স্বাধীন সাংবাদিকতা, শিক্ষা ব্যবস্থা, বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা এমনকি জুলাই গণহত্যার শিকার শহীদদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে সেই বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিলো তার ভাষণে।
বুঝা যায়, প্রথম ভাষনেই তিনি জাতিকে তাদের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন। তারা রাষ্ট্রের কোন কোন সেক্টরে সংস্কার করবেন তারও একটি পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় তার ভাষণে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, মেয়াদের একদিনেরও বেশি ক্ষমতায় থাকতে চান না। সংস্কার শেষ হলেই তারা অংশগ্রহণমূলক ফেয়ার একটি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
পুরো ছাব্বিশ মিনিটের ভাষণ আপনি যখন শুনবেন, যেই মুহূর্তে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পালিয়ে গেলেও তার সময়ের ক্ষতগুলো এখনো দগদগে হয়ে, রক্তক্ষরণ যখনও চলছে, শহীদের রক্ত যখনও তাজা ঠিক সেই মুহূর্তে এই ভাষণটি আমাদের মনে প্রশান্তি দেয়, আমাদের আশান্বিত করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভাষণে যখন বলেন, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন সব আইনের নিপীড়নমূলক ধারা সংশোধন করা হবে’ এই বাক্যটি আমাদের আতঙ্কিত করে। আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে পাওয়া দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই আমরা কতিপয় লেখক এক্টিভিস্ট আওয়াজ তুলেছিলাম, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন’ যা পরবর্তীতে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ তৎপরবর্তী আইসিটি আইন ২০২৩ সংশোধন বা সংস্কার নয় এ ধরণের আইন বাতিল করতে হবে। গত ১৪ আগস্ট ডিএসএ ভিক্টিম নেটওয়ার্ক জাতীয় প্রেসক্লাবে মানবন্ধন করে এই আইন বাতিলের জন্য আইন উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে। স্বভাবতই আমরা আশা করেছিলাম যে, প্রধান উদেষ্টার ভাষণে এই আইনের সংশোধন নয় বাতিলের প্রস্তাবনা থাকবে। উনি বলেছেন, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন আইনের নিপীড়নমূলক ধারা সংশোধন করা হবে।’
কিন্তু আমরা বলতে চাই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন আইন আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে থাকতে পারে না। ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দ্বিতীয় বার স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। কোটা দিয়ে আন্দোলন শুরু শেষে গিয়ে ঠেকেছে বৈষম্যহীনতায় কিন্তু এই আন্দোলন শুধু ৩৬ দিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। গত ১৫ বছর ধরে মানুষের বাক-স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে, মানুষের যন্ত্রণা, কান্না, চিৎকারকে দমিয়ে রাখার যত সব প্রচেষ্টা ছিল সবকিছুর সম্মিলিত ক্রোধের এক মহাবিস্ফোরণ ছিল এই আন্দোলন। আর এর সব কিছুই করা হয়েছিল মূলত ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে এমন আইনের’ মাধ্যমে। আমরা বিশ্বাস করি এই সরকার মত প্রকাশকে কোনভাবেই বাধাগ্রস্থ করবে না। তারা নেক নিয়তেই নিপীড়নমূলক ধারাগুলো সংশোধন করবে। কিন্তু এই সরকার কি আজীবনের সরকার? তারা একদিন নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে এমন প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছেন। ফলে পরবর্তী যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা যে ‘সংশোধিত ধারা’র ভেতর থেকেই এই আইনটিকে ব্যবহার করে ভিন্নমতকে দমন করবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? কথায় আছে, আইনের ফাঁক ফোকরের সীমা পরিসীমা নেই। তাই জেনে বুঝে এরকম একটি আইনকে আপনারা কেনো জিইয়ে রাখতে চান? এই সরকারের কাছে মানুষের চাওয়া অসীম, তারা হয়তো সেগুলো আস্তে আস্তে পূরণও করবেন, বেশিরভাগ দাবি দাওয়ার সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কিন্তু এই আইনটির বিষয়ে আমাদের যে দাবি তা পূরণ করার করার জন্য রাষ্ট্রের একটি টাকাও খরচ হবে না। শুধু একটু দরদ খরচ করতে হবে এই দেশের মানুষের জন্য। তাদের জবান খুলে দেওয়ার জন্য। একটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সরকারের কাছে এই চাওয়া কি আমাদের খুব বেশি?
লেখক: কবি, এ্যক্টিভিস্ট