বন্যাকবলিতদের জন্য বুয়েটের মডিউলার স্কেলেবল প্রোটোটাইপ

বন্যা বাংলাদেশের একটি নিয়মিত ও প্রত্যাশিত দুর্যোগ। দেশের বেশকিছু জনপদের মানুষকে প্রতিবছরের একটা নির্দিষ্ট সময় বন্যার মুখোমুখি হতে হয়। তবে সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি বড় অংশের মানুষ যে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হলেন, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি এবং দুর্ভোগ তখনই বেশি হয়, যখন কোনো প্রস্তুতি থাকে না। ফলে এবারের বন্যায় ফেনী-নোয়াখালি-লক্ষ্মীপুরসহ প্রায় দশটি জেলা একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত অর্ধকোটি মানুষ।

বন্যার পানি বাড়লে যাদের ঘর ডুবে যায়, তাদের কথা চিন্তা করে একটি ভাসমান মডিউলার স্কেলেবল প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের একজন শিক্ষক ও একদল শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তারা তাদের ধারণাটি দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছেন। একই প্রোটোটাইপ ব্যবহার করে অনেককে উদ্ধার করা হয়েছে, পাশাপাশি দীর্ঘসময় পানিতে ভেসে থাকার জন্যও এটি কাজে লেগেছে। বুয়েট প্রাঙ্গণে তৈরি করে এমন কয়েকটি প্রোটোটাইপ ট্রাকে করেও পাঠানো হয়েছে বন্যাকবলিত এলাকায়।

ভাসমান প্ল্যাটফর্মের প্রোটোটাইপ

এই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহেরুল কাদের প্রিন্স। তিনি জানান, 'বন্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে কী করা যায়, সেটি ভাবছিলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি, তাদের জন্য পর্যাপ্ত নৌকা যোগাড় করা হয়তো সম্ভব না। কিন্তু সীমিতসংখ্যক নৌকা ব্যবহার করে ভাসমান প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায় কিনা, সেটি প্রথমে চিন্তা করেছি। সাধারণ ধাঁচের সাড়ে ১৮ ফুট লম্বা ও সাড়ে ৬ ফুট প্রস্থের নৌকার ব্যবহারযোগ্য অংশ মাত্র ৬৮ বর্গফুট। কিন্তু এমন দুই নৌকা ব্যবহার করে এর ওপর যদি বাঁশের ফ্রেম দিয়ে একটি বেজ তৈরি করে বসানো হয়, তাহলে সেখানে ২২০ বর্গফুট জায়গায় অনেক লোকের ঠাঁই হবে। বোরাক বা বাইজ্জা বাঁশে এই ফ্রেম হতে পারে, স্থানীয়রা এটি সহজেই তৈরি করতে পারবেন। মেঝেতেও থাকবে বাঁশ। আর ছই বা ছাদ তৈরি করা যেতে পারে পলিথিন, বা ত্রিপল দিয়ে।

প্রিন্স এই ধারণাটি ফেসবুকে শেয়ার করার পর আরও অনেকে সাড়া দেন। এরপর স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও কয়েকজন পেশাদার স্থপতিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তৈরি করেন ১২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের কয়েকটি মডিউল। নিচে ড্রাম রেখে উপরে বাঁশের তৈরি প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে ভাসমান মডিউলে পরিণত করা হয়ে এগুলোকে। মডিউলার স্কেলেবল প্রোটোটাইপ বলতে, ড্রামের ব্যবহার বাড়িয়ে এর আয়তন বৃদ্ধির সুযোগ আছে, বেশিসংখ্যক লোক ধারণের ব্যবস্থা করারও সু্যোগ আছে, সেই পদ্ধতিগুলো তারা অঙ্ক করে দেখিয়েছেন। এরসঙ্গে টয়লেট যুক্ত করার পরিকল্পনাও তারা করে দেখিয়েছেন।

স্থপতি মাহেরুল কাদের প্রিন্স বলেন, প্রান্তিক এলাকার সাধারণ মানুষ জানেন, কিভাবে বাঁশ বাধতে হয়, কেমন করে ভেলা বানাতে হয়। কলাগাছ, কলসি, ড্রামসহ নানাকিছু ব্যবহার করেই ভেলা বানানো যায়। স্থানীয়দের প্রচলিত জ্ঞানকে আরেকটু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা ছিল আমাদের। আমরা টেলিফোনে তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ রেখেছি। তারাও আমাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছেন। ধারণ ক্ষমতার হিসাবনিকাশ করে দ্রুতসময়ের মধ্যে কিছু বোট বা ভেলা তৈরি করা হয়েছে। আমরা এর সর্বোচ্চ ব্যবহারোপযোগিতার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছি।

ভাসমান এই প্রোটোটাইপ তৈরির পর প্রিন্স কাজ করেছেন একধরনের উভচর টয়লেট নিয়ে। সেটি সহজে তৈরির প্রক্রিয়া ও ধাপগুলোও তিনি তুলে ধরেছেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে। তিনি জানান, অরিগ্যামি টেকনিক অনুসরণ করে টয়লেটের একটি নমুনা এমনভাবে তৈরি করেছেন তারা, যা ভাজ করা যায়। সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা যায়। আবার বন্যার সময়ে তা পানিতে ভেসে থাকবে, শুকনো মৌসুমেও ব্যবহার করা যাবে। এখানে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকগুলো নিয়েও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভেবেছেন তারা।

অরিগ্যামি অনুসরণ করে ডিজাইন করা টয়লেট

সাধারণত বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। পানি পরিশোধনের জন্য ট্যাবলেট বা কেমিক্যাল প্রয়োজন হয়। তবে কোনোকিছু ছাড়া প্রাকৃতিকভাবেও তা করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রিন্স। নিম গাছের ডাল ব্যবহার করেও এমনটা করা সম্ভব। এই বিষয়টি নিয়ে আরও বিশদভাবে জানতে তারা কাজ করছেন। স্থপতি প্রিন্স বলেন, আমাদের চারপাশে অনেক 'ইন্ডিজেনাস নলেজ' ছড়িয়ে আছে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ দুর্যোগ মোকাবেলা করেছে। কিছু নির্দিষ্ট পেশার মানুষেরাও বংশ পরম্পরায় জেনে এসেছেন, বাঁশ কিভাবে ব্যবহার করলে সেটির আয়ু বাড়ে, মজবুত হয়। কোন কোন উপকরণ ব্যবহার করে ভেলা বানিয়ে বন্যায় ভেসে থাকা যায়। এমন হাজারও জ্ঞান তাদের মাঝে থাকলেও এর কোনো লিখিত রূপ নেই। প্রয়োজন এই বিষয়গুলোকে সংগ্রহ করা এবং গবেষণার মাধ্যমে এমন কিছু উদ্ভাবন করা, যা আরও কার্যকর হবে; কিন্তু আমাদের নিজস্বতা হারাবে না। এবারের দুর্যোগে আমরা ছোট পরিসরে সেই চেষ্টাই করেছি। একইভাবে আমাদের স্থাপত্য ও নির্মাণে যদি এসব ধারণারই প্রতিফলন ঘটানো হয়, তবে তা আরও বেশি দুর্যোগ-সহনশীল হবে।