ব্যস্ত এই নগরের অন্যতম বড় সংকট হলো মানসম্মত গণশৌচাগার না থাকা। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীরা যখন কাজে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হন, শৌচাগারে যাওয়া এড়াতে তারা লম্বাসময় পানি পান না করে থাকেন। অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবক্ষেত্রেই একই দশা। ফলে তাদের নানা শারিরীক সমস্যায় ভুগতে হয়। এছাড়া এই শহরে প্রতিদিন কাজের উদ্দেশে যাতায়াত করে অন্তত এক কোটি মানুষ। তাদের জন্য পুরো ঢাকা শহরে দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় বড়জোর দেড় শ'টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে অনেক পাবলিক টয়লেট নোংরা ও দুর্গন্ধের ফলে ব্যবহার করা দায়। সর্বোপরি এই চিত্র নগরস্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।
অন্যদিকে আরও একটি সংকট হলো, নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে শহরে খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্তসংখ্যক গণপরিসর গড়ে ওঠেনি। ফলে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের অবসরযাপনের জায়গারও অভাব রয়েছে। এতে যেমন সব বয়সের মানুষ সুস্থ বিনোদনের অভাব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে অস্থিরতা। বিষয়টির বহুবিধ নেতিবাচক সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করেন সমাজবিজ্ঞানী, নগরবিদ, স্থপতি ও সংশ্লিষ্টরা। বাস্তবে এর সমাধান খুঁজতে ও মানবিক নগর বিনির্মাণে যারা কাজ করছেন, তাদেরই একজন তরুণ স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ ফারহানা রশিদ তনু। ভূমিজ নামের একটি সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তিনি। নগরবাসীর জন্য, বিশেষ করে নারীদের কথা চিন্তা করে মানসম্মত গণশৌচাগার নির্মাণ ও গণপরিসর তৈরিতে কাজ করে চলেছে ভূমিজ। তবে কেবল ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য বড় শহরেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।

ভিন্ন এই উদ্যোগের পেছনের গল্প জানালেন তনু। তিনি বললেন, 'শহরে নাগরিকবান্ধব যেসব স্থাপনা থাকতে হয়, সেসব স্থাপনা কোথায় আছে এবং এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ধরন কেমন হওয়া উচিত -তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। নগরের গণপরিসরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো গণশৌচাগার। এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য জড়িত। একজন নারী হিসেবে আমি ভুক্তভোগী, কারণ আমি যখন স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম তখন কোথাও মানসম্মত টয়লেট খুঁজে পাইনি। কর্মক্ষেত্রেও একই চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে। প্রায় সব নারীর ক্ষেত্রে গল্পটা একই। আমার এক পরিচিতজনের তো কিডনিই বিকল হয়ে গিয়েছিল। স্থাপত্যে পড়ার পর আমি যখন নগর পরিকল্পনা নিয়েও পড়াশোনা করলাম, তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার এই জ্ঞানটুকু আমার চারপাশের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজে লাগাব। যার খানিকটা রূপ দিতে পেরেছি আমার সংস্থা ভূমিজ'র প্রায় অর্ধশত পাবলিক টয়লেট প্রকল্পের মাধ্যমে।'
তিনি জানান, কিছু টয়লেট নতুন করে তৈরি করা হয়েছে, আর কিছু কিছু পুরনো টয়লেটকে তারা সংস্কার-রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনা করছেন। একটা ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়টি আলাদাভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। এনভায়রনমেন্টাল সেন্সরের সাহায্যে দেখা হচ্ছে সেখানে গন্ধ আছে কিনা; কখন কতোজন মানুষ টয়লেটটি ব্যবহার করছেন, এর মধ্যে নারী ও পুরুষের সংখ্যা কতো -সব তথ্যই পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তনু বলেন, 'আমরা একটা সার্ভে-তে দেখেছি, মানুষ পাবলিক টয়লেট চেনেন দুর্গন্ধ দিয়ে! আমরা এই চিত্র বদলাতে চাই।'
স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ ফারহানা রশিদ তনু আরও জানান, পাবলিক টয়লেট ছাড়াও ভূমিজ'র পক্ষ থেকে বেশকিছু পকেট পার্ক ডিজাইন করা হয়েছে। এর একটি হলো জল্লাদখানা পার্ক। ঢাকায় বধ্যভূমির সামনের সড়কের উল্টোপাশের ওই জায়গাটিতে একটি এসটিএস (ময়লা স্থানান্তরের জায়গা) ছিল ও বাকি অংশ পরিত্যক্ত ছিল, সেখানে মাদকসেবীদের আখড়া বসতো। সেই জায়গাটি এখন আমূল বদলে গেছে। তারা পুরো জায়গাটি ঢেলে সাজিয়েছেন। সেটি এখন সবুজে আচ্ছাদিত। রয়েছে পথচারীদের হাঁটাচলা ও বসার স্থান, পাশাপাশি বাচ্চাদের খেলার জায়গা। এসটিএস ও টয়লেটের দেয়াল বর্ণিল রঙয়ে সাজানো হয়েছে। একপাশে তৈরি করা হয়েছে মুক্তমঞ্চ। সেখানে এখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম এই পার্ক তৈরিতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। স্থানীয়রাও পার্কটিকে সুবিন্যস্ত করার কাজে জড়িত ছিলেন।
স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ ফারহানা রশিদ তনু বললেন, আসলে শহর বদলানোর কাজটি কারোর একার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু সিটি করপোরেশন বা অন্যকোনো সংস্থার পক্ষেও এটি সম্ভব নয়। সবাই যদি শহরকে ভালোবাসেন, তবে পরিবর্তন সম্ভব। আমি কোথায় থুতু ফেলব, কোথায় ফেলব না, সেই বোধ নিজের ভেতর জাগ্রত করতে হবে। প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে ইতিবাচক রূপান্তরের জন্য কাজ করি, আমাদের শহরটা বদলাবে।

