প্রশাসনহীন কুবি: যেমন উপাচার্য চান শিক্ষার্থীরা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের। এতে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ভেঙে পড়েছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কাঠামো। তার ব্যতিক্রম ঘটেনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও। উপাচার্য থেকে শুরু করে উপ-উপাচার্য, ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা পরিচালক, আইকিউএসির পরিচালক, প্রক্টরিয়াল বডি, পরিবহন প্রশাসক, এবং তিন হলের প্রাধ্যক্ষ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। তবে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. জাকির ছায়াদুল্লাহ খানকে উপাচার্য হিসেবে আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ দেয়া হলেও এখনো স্থবির হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম। আর এই স্থবিরতা কাটাতে  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী পদ উপাচার্য নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনে কারা থাকবেন, উপাচার্য কে হবেন তা নিয়ে নানা মহলে চলছে আলোচনা।

নতুন উপাচার্য কেমন হওয়া উচিত এবং নতুন উপাচার্যের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার বিষয়টি জানতে বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠনের দায়িত্বে থাকা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা হয় দৈনিক ইত্তেফাকের। 

উপাচার্যকে হতে হবে নির্দলীয়, বন্ধ করতে হবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দলাদলি 

সর্বপ্রথম আমি একজন শিক্ষার্থীবান্ধব উপাচার্য চাই। যিনি শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করবেন। এজন্য সর্বপ্রথম জরুরি দলীয় লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক রাজনীতির বাইরের কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। অতীতে আমরা দেখেছি দলীয় পরিচয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। দলীয় স্বার্থ দেখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নীচে নেমেছে এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পায়নি। যার ফলাফল কুবি শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছেন নানানভাবে। শিক্ষকদের দলাদলির কারণে ভুক্তভোগী হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সেক্ষেত্রে যিনি উপাচার্য হবেন তাকে অবশ্যই ক্লিন ইমেজের এবং নিজস্ব স্বকীয়তা থাকতে হবে। বিশেষ কোন দলের না হয়ে তিনি হবেন সবার উপাচার্য। যিনি সকলকে একই পাল্লায় মাপবেন। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ করবেন। শিক্ষার্থীরা যাতে বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের যুগোপযোগী করে তৈরি করতে পারে সেজন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবেন। যিনি ক্যাম্পাসে শুধু  ইট-পাথর দিয়ে ভবনের উন্নয়ন নয় বরং গবেষণা, পর্যাপ্ত ডিজিটালাইজড সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগের সেশনজট নিরসনে কাজ করবেন। বেশিরভাগ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় উপাচার্য। তবে এবার বিশ্ববিদ্যালয়কে যিনি ভালো চেনেন, জানেন এবং গবেষক এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন অনেক যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন। এছাড়া শিক্ষক সংকট, ল্যাব সমস্যার সমাধান, আবাসন ও পরিবহন সংকট নিরসনেও নতুন উপাচার্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে আশাকরি।

— নুসরাত রশিদ, গণিত বিভাগ

 

ভিসি হবেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেতুবন্ধ 

ভিসি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক। এ হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকতা, কর্মচারীদের মধ্যকার সেতুবন্ধ। তাই একজন ভিসি হবেন মেধা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি সমৃদ্ধ। ব্যক্তি জীবনে সবার মতো তিনিও কোন না কোন মতাদর্শ কিংবা নীতিতে বিশ্বাসী হতে পারেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে কাজ করা জরুরি। একজন ভিসি তার অফিস কক্ষ থেকে বেড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা পর্যবেক্ষণ করবেন। সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পরামর্শের মধ্য থেকে উপযুক্ত সমাধান বেছে নিবেন অর্থাৎ তার মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাব থাকা জরুরি। একই সাথে গঠনমূলক সমালোচনা বা দ্বিমত গ্রহণের সক্ষমতা থাকতে হবে। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষার করার দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত থাকে। 
সর্বশেষ একজন দূরদর্শী, নেতৃত্ব গুণাবলি সমৃদ্ধ এবং অভিভাবক সুলভ ভিসি কুবিয়ানরা আশা করে। যিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে তার পরিবারের ন্যায় পরিচালনা করবেন এবং যে কোন সমস্যায় পরিবারের সদস্যদের একতাবদ্ধ রাখবেন।

— মাহিনুর রহমান নাঈম, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ 

 

শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে উপাচার্যকে উদ্যোগী হতে হবে

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিকভাবে কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে, যা পূরণ না হলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং শেখার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের খাবার ও পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতা। হল ও ক্যাফেটেরিয়ায় শিক্ষার্থীরা যেসব খাদ্য গ্রহণ করে তার বেশিরভাগই অস্বাস্থ্যকর এবং মূল্য বেশি। তাই হল ও ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান উন্নয়নে উপাচার্যকে ভাবতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বিগত সময়ে কোন উপাচার্যই শিক্ষার্থীদের মৌলিক এই চাহিদার বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করেননি। 
তাই নতুন উপাচার্য এই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। এছাড়াও বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পারিবারিক, সামাজিক ও অ্যাকাডেমিক নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে নতুন উপাচার্যকে লোক দেখানো কর্মশালা বা অনুষ্ঠানের আয়োজন না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যা বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে। 

— নুসরাত রশ্নি, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ

 

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যোগ্যদের মূল্যায়ন করা জরুরি 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দলমত নির্বিশেষে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা জরুরি। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া উচিত শিক্ষক নিয়োগে। কারণ শিক্ষক হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিকড়। এ শিকড় যদি মজবুত হয় তাহলে গাছ ঝড়-ঝঞ্ঝাসহ যেকোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারবে। যেই কারণে শিক্ষক নিয়োগ  থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগে যোগ্যতার মূল্যায়ন একান্ত জরুরি। দলীয়করণ নীতি পরিহারপূর্বক দতমত নির্বিশেষে যোগ্যতার দিকটি বিশেষভাবে গণ্য করা উচিত। পাশাপাশি বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জবাবদিহিতার বিষয়টি সবচেয়ে অগ্রাহ্য বলে দেখা যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে নিজস্ব আইন যা প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর করা জরুরি। কিন্তু প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট আইনের  অপপ্রয়োগ করে অনুগতদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে যোগ্যতা থাকার পরও মূল্যায়ন না করার কারণে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি  হচ্ছে যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

— মোহাম্মদ রাজিব, সাধারণ সম্পাদক, তরুণ কলাম লেখক ফোরাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় 

 

যুগের সাথে তাল মেলাতে প্রযুক্তি বান্ধব উপাচার্যের কোন বিকল্প নেই

প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আমূল পরিবর্তন ঘটছে। সেক্ষেত্রে যুগের সাথে তাল মেলাতে এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করতে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। এজন্য নতুন উপাচার্যকে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োগের বিষয়ে ভালো ধারণা রাখতে হবে। 
যেমন: ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়নের আওতায় উন্নতমানের ইন্টারনেট সংযোগ, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, এবং স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন করাসহ  শিক্ষার্থীদের জন্য ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। যেখানে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস, কোর্স ম্যাটারিয়ালস ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারবে। এ ব্যাপারে শিক্ষকগণেরও পর্যাপ্ত ট্রেনিং এবং কর্মশালার প্রয়োজন। 
গবেষণা ও উন্নয়ন: গবেষণার জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা রিসোর্স নেই। নেই উন্নত বিশ্বের বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে রিসার্চ কোলাবোরেশান। টেকনোলজি আপডেট করে কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কাজ করতে হবে। 
 ইন্টারন্যাশনাল পার্টনারশিপ: উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে পার্টনারশিপ গড়ে তোলা, যাতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় প্রোগ্রাম চালু করা যায়।
ডেটা অ্যানালাইটিক্স: শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে ডেটা অ্যানালাইটিক্স ব্যবহার করা, যাতে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়।
ডিজিটাল সিকিউরিটি নিশ্চিত : আমাদের ক্যাম্পাসের অনেক ডিজিটাল ডিভাইসেরই সিকিউরিটি দুর্বল। যেমন আমাদের লাইব্রেরির ল্যাবের ও রাউটার গুলোতে যে কেউ এক্সেস নিয়ে নিতে পারবে এতোটা দু্র্বল পাসওয়ার্ড! এখানে এক্সেস নিয়ে কানেক্টেড ডিভাইসগুলোর আইপি তাদের ইনফরমেশন লিক করতে পারে যদি হ্যাকারদের হাতে পড়ে যায়। তাই এসব ব্যাপারে সজাগ থাকবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন এমন উপাচার্যকেই আমরা চাই।

— আমান ভূঁইয়া, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

 

প্রশাসনের সাথে সংগঠনগুলোর সম্পর্ক থাকবে সহযোগিতার, প্রতিযোগিতার নয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা থাকার সুবাদে প্রশাসনিক জটিলতা গুলো কাছ থেকে দেখেছি। এখন পর্যন্ত সংগঠনগুলোর সাথে প্রশাসনের কোন কোলাবরেশন নেই, বরাদ্দ থাকে নামমাত্র। আবার নিবন্ধনকৃত সংগঠনগুলোর জন্য যে বাজেট বরাদ্দ থাকে সেগুলো পাওয়া আরো বিড়ম্বনার। এর বাইরেও বিগত কয়েকবছর ব্যক্তি স্বার্থে সংগঠনগুলোকে নিষ্ক্রিয় করার একটা হীন প্রবণতা ছিল। বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও টুর্নামেন্ট আয়োজনে প্রশাসনের অসহযোগিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই বিষয়গুলো পীড়াদায়ক ছিল। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটা সংগঠনের স্বকীয়তা থাকবে। এখানে ফরমায়েশি চর্চার সুযোগ নেই। আমার শিক্ষাজীবন ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে, দায়িত্বের মেয়াদ শেষের দিকে একেবারেই। তবু প্রত্যাশা থাকবে প্রাণের ক্যাম্পাসে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিজস্বতা থাকবে, বাজেট থাকবে কাজের পরিসর বিবেচনায়। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে এমন একজন শিক্ষাবিদ আসবেন যার নেতৃত্বে শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতির সুষম বিকাশ ঘটবে। আগামী দিনের সাংগঠনিক সহযোদ্ধাদের সাথে প্রতিযোগিতা নয় সহযোগিতার সম্পর্ক থাকবে প্রশাসনের।

— জান্নাতুল ফেরদৌস, সভাপতি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি