ফেনী ও এর আশপাশের এলাকায় ঘটে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ বন্যা। বন্যার পানি নেমে গেলেও বিভিন্ন অবকাঠামোয় ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। এই বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত অর্ধকোটি মানুষ, আর নিম্নআয়ের অসংখ্য মানুষ হারিয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাই। যখন এমন দুর্যোগ আসে, তখন কিছুদিন এ নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে পরবর্তী দুর্যোগের প্রস্তুতিতেও বড়ধরনের ঘাটতি থেকে যায়। এই বিষয়টি মাথায় রেখে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য টেকসই স্থাপনা ও আবাসনের উপযুক্ত ধারণা অনুসন্ধানে কাজ করছেন একদল স্থপতি ও স্থাপত্যের শিক্ষার্থী। ঢাকায় ও ফেনীর প্রত্যন্ত এলাকায় সপ্তাহব্যাপী কর্মশালার মাধ্যমে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা, নিজেদের সৃজনশীলতা ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময় করছেন তারা।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ এবং দ্য ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগ যৌথভাবে এই উদ্যোগ নিয়েছে।
এই কর্মশালার নাম দেওয়া হয়েছে 'সঙ্গত'। কেন এই নাম, জানতে চাইলে কর্মশালার অন্যতম সমন্বয়কারী ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেখ ইতমাম সউদ বলেন, 'আমরা আমাদের স্থাপত্যে নানারকম অসঙ্গতি দেখি। অনেকক্ষেত্রেই পরিকল্পনাগত ভুল থাকায় তা প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। বড় শহরের বাইরের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর জন্য উপযুক্ত ঘরবাড়ি বা আবাসন কেমন হওয়া প্রয়োজন, সে ব্যাপারে আমাদের শিক্ষার্থীদেরও জানার সীমাবদ্ধতা থাকে। এছাড়া দেখে থাকবেন, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য বিভিন্ন হাউজিং প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়। কিন্তু এর পেছনে গবেষণায় ঘাটতি থাকায় প্রকল্পগুলো বেশিরভাগক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। আমরা চাই স্থানীয়দের সঙ্গে মিলে তাদের চাওয়া-পাওয়াকে বিশদভাবে জেনে সঙ্গতিপূর্ণ সমাধান দিতে।'
১২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এই কর্মশালা। এর প্রথমভাগে চারদিনে ঢাকায় স্থাপত্যের ১২ জন শিক্ষকের নেতৃত্বে ৪৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তারা চলে গেছেন ফেনীর রাজারহাটের ধলিয়া নামক স্থানে। সেখানে তারা স্থানীয়দের সঙ্গে সরাসরি কাজ করবেন এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামত, পুনর্বাসন ও পরবর্তীসময়ের জন্য টেকসই স্থাপনা তৈরির ব্যাপারে আলোচনা করবেন। এটি চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। কর্মশালা শুরুর আগে স্থপতিদের একটা দল ওই এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন এবং পুনর্বাসনের ব্যাপারে প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করেছেন।
কর্মশালায় সমন্বয়কারী হিসেবে আরও যুক্ত থাকা আছেন স্থপতি জিয়াউল ইসলাম ও স্থপতি অনুপ কুমার বসাক। রিসোর্স পারসন হিসেবে রয়েছেন স্থপতি ফয়সাল কবির হিমুন, স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির ও স্থপতি সাদ বিন মোস্তফা। শিক্ষার্থীদের স্টুডিও মেন্টর হিসেবে রয়েছেন স্থপতি ফারহানাজ খাদিজা, স্থপতি রিফাত মেহজাবিন, স্থপতি রফিকুল ইসলাম, স্থপতি এহসানুল হক স্বপ্নীল, স্থপতি আফরা আনান সাবা। পুরো আয়োজনের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন স্থপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমেদ, স্থপতি ইকবাল হাবিব এবং স্থপতি ড. নুরুর রহমান খান। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে সহসভাপতি স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুলও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
কর্মশালা প্রসঙ্গে স্থপতি শেখ ইতমাম সউদ আরও বলেন, 'দুর্যোগকবলিত এলাকায় গিয়ে সেখানকার অবকাঠামো নিয়ে গবেষণা, এবং সে গবেষণালব্ধ জ্ঞান নিজেরাই হাতে কলমে প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে স্থাপত্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা। এই উদ্যোগে বরেণ্য স্থপতিদের অনেকেই সহযোগিতা করছেন। আমাদের এই কাজের ফলাফল হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে সীমিত পরিসরে একটা সমাধান দেবে, হয়তো একসঙ্গে বহু মানুষের কাছে পৌঁছানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি প্রত্যেকেই যার যার জায়গা থেকে প্রায়োগিক বিষয়ে অবদান রাখলে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অনেকবেশি সহজ হবে।'