কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটে বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সামনে একটি প্রেজেন্টেশন দেন। সেই উপস্থাপনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। মূলত আশিকের প্রাঞ্জল ইংরেজি বলা ও শরীরী ভাষা সকলকে আকৃষ্ট করেছে, যে কারণে প্রশংসার জোয়ারে ভেসেছেন তিনি। অনেকসময় সাধারণ কিছু তথ্য, আলোচনা বা পাওয়ারপয়েন্টে তৈরি সাদামাটা স্লাইডও অসাধারণ হয়ে ওঠে উপস্থাপনের ভঙ্গির কারণে—যা দু’জন যোগ্য মানুষের মাঝেও সূক্ষ্ম ব্যবধান বা পার্থক্য গড়ে দেয়।
অনেকেই আছেন, গবেষণায় নিয়োজিত থেকে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যউপাত্ত নিয়ে কাজ করেন, তবে উপস্থাপনের দুর্বলতার কারণে সেটি মানুষের মাঝে দাগ কাটতে পারে না। আবার কেউ কেউ সীমিত বিষয়বস্তুকেই দারুণভাবে আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করে নেন।
বর্তমান সময়টা আসলে নিজেকে উপস্থাপন করার যুগ। আপনি কতোগুলো পোস্টগ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি নিয়েছেন, কোন কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন, সেগুলো যেমন জরুরি—তেমনি জরুরি নিজেকে উপস্থাপন করতে পারাটাও। বিশেষ করে, আপনার মগজে যে আইডিয়াগুলো কিলবিল করছে, সেটা যথাস্থানে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা গেলেই আপনি এর বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে পারবেন।
অবশ্য বাস্তবে আমরা পরিক্ষার ফলাফল ভালো করার ব্যাপারে যতোটা ভাবি, প্রেজেন্টেশন বা অন্যান্য স্কিল ডেভেলপ করার ব্যাপারে ততোটা সচেতন নই। তাই প্রায়ই দেখা যায়, স্কুল বা কলেজে যে বন্ধুটি পেছনের বেঞ্চে ছিল, সে তরতর করে সামনে এগিয়ে গেছে। কিন্তু বরাবরই রোল নম্বর প্রথম পাঁচের ভেতরে থাকা অন্যজন হয়তো সে তুলনায় বেশিদূর যেতে পারেনি। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, উপস্থাপনের এই দক্ষতা বা প্রেজেন্টেশন স্কিল কেবল কর্পোরেট সেক্টরে বা টেলিভিশন সাংবাদিকতা ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজে লাগে। তবে তা সত্যি নয়।
বিসিএস-সহ যেকোনো প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও প্রেজেন্টেশন স্কিল জরুরি। কারণ, পাবলিক সার্ভিস কমিশনে যখন সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়, সেখানেও যাচাই করা হয় প্রার্থীদের কথা বলার ধরন ও শরীরী ভাষা। ভালো ইংরেজিও জানতে হয়। আপনি যখন পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে দায়িত্ব পালন করবেন, সেখানেও আপনার সাবলীল আলাপচারিতা ও অন্যকে বোঝাতে পারার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে রাষ্ট্রের স্বার্থ। প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে যখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, কিংবা সচিব হবেন, প্রতিটি পদেই আপনার হাজারো মানুষের সামনে নিঃসংকোচে কথা বলার দক্ষতা প্রয়োজন হবে। শিক্ষক হলেও শতশত শিক্ষার্থীর ভেতর স্ফুরণ তৈরি করার উদ্যোম প্রয়োজন। তাদের মনোজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন তখনই, যখন তারা আপনার কথা শুনে মুগ্ধ হবে। সুতরাং, প্রেজেন্টেশন স্কিলের প্রয়োজনীয়তা পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়, এমন কোনো কাজ নেই বললেই চলে।
এছাড়া যারা ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন, ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকেও প্রেজেন্টেশন এবং নেগোসিয়েশনে দক্ষ হতে হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যখন ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, তখন ভালো কাজের নিশ্চয়তা ও নির্ভরতা বোঝাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সাবলীল ভাষায় কথা বলা জরুরি।
কর্পোরেট সেক্টরে প্রেজেন্টেশন ও স্মার্টনেসের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রায় সবার জানা। সেখানে যেমন কেতাদুরস্ত পোশাক পরে ক্রেতা বা বড় বড় বায়ারদের মিটিংয়ে যেতে হয়, তেমনি কথা বলার মাধ্যমে 'কনভিন্স' করতেও জানতে হয়। তাছাড়া যে কন্টেন্টটি আপনি তৈরি করবেন, সেটিও হতে হবে স্মার্ট ও ইউনিক। সবমিলিয়েই আপনি নিজেকে ও আপনার প্রতিষ্ঠানকে উপস্থাপন করবেন, নিত্যনতুন আইডিয়া শেয়ার করবেন।
নিজেকে সচেতনভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি এখনকার সময়ে প্রযুক্তিতে যে যতো দক্ষ, সে ততো এগিয়ে রাখে নিজেকে। যেমন ‘প্রেজেন্টেশন স্কিল’ কথাটারই যদি তুলনা করি, একসময় তা কেবল বাগ্মীতার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করতো। সেক্ষেত্রে উপস্থিত বক্তৃতায় প্টু হলেই হতো। কিন্তু এখন এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ হয়েছে ডিজিটাল কন্টেন্ট। পাওয়ারপয়েন্ট বা অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহার করে আপনি যে স্লাইড-শো তৈরি করবেন, এর ডিজাইন, লেআউট, গ্রাফিক, থিম, কালার প্যালেটও গুরুত্ব বহন করবে।
আপনি যে প্রোডাক্টটি বিক্রি করবেন বা যে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি হিসেবে অন্যের সামনে কথা বলবেন, সেখানে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব বহন করবে। বেসরকারি চাকরির যেকোনো ভালো পদে যোগ দিতে চাইলে প্রয়োজন হবে আকর্ষণীয় পোর্টফোলিও, সিভি। বাজারের ফর্দের মতো গৎবাঁধা বায়োডাটায় নাম, বাবার নাম, বাসার ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ ইত্যাদি একগুচ্ছ অদরকারি তথ্যের পরিবর্তে সিভি-তে আপনি নিজেকে কতোটা ডায়নামিকভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন, সে ব্যাপারেই নজর দেবেন চাকরিদাতারা। সেটিই আপনাকে প্রতিযোগিতার দৌড়ে এগিয়ে রাখবে।
সোজা কথায়, প্রেজেন্টেশন স্কিল কেবল পোশাকি বিষয় নয়, শুধু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সন্নিবেশিত করাও নয়, বা স্রেফ একটি ভালো কন্টেন্ট তৈরি করাও নয়। এটি একটি সামগ্রিক বিষয়। এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন, এটি তাদের স্কিল ডেভেলপের আদর্শ সময়। বিভিন্ন কোর্সের অ্যাসাইনমেন্টের অংশ হিসেবে আপনাকে সহপাঠীদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায়ই প্রেজেন্টেশন দিতে হতে পারে। এই প্রতিটি প্রেজেন্টেশনকেই একেকটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করুন। শুধু পাস করা বা কোর্সে উতরে যাওয়ার কথা না ভেবে নিজেকে শাণিত করার কথা ভাবুন। একটু একটু করে নিজের প্রেজেন্টেশন স্কিলের উন্নতি ঘটান। দেখবেন, চার বছর পর যখন আপনি ডিগ্রি সম্পন্ন করে বের হবেন, তখন চাকরির বাজার কিংবা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার অফার পাবার দৌড়েও আপনি এগিয়ে যাবেন। মাস্টার্স, পিএইচডি থেকে শুরু করে চাকরিক্ষেত্রের সকল কাজেও আপনি নিজেকে বহুদূরে নিয়ে যেতে পারবেন অনায়াসে।