নাটোরে জৌলুস হারানো ‘মুক্ত মঞ্চ’ এখন ময়লার ভাগাড়

প্রায় এক দশক আগের কথা, নাটোরের গুরুদাসপুরে একটি মুক্ত মঞ্চে প্রতি সন্ধ্যায় বসতো গানের আসর। সুরের মূর্ছনায় ভিড় জমাতো সংস্কৃতি প্রেমীরা। সন্ধ্যা নামতেই ঝলমলে বাতি আর ছোট-বুড়োদের উচ্ছ্বাসে জমে উঠতো পুরো এলাকা। তবে সময়ের পালা বদলে সেই মঞ্চের আশপাশে এখন কেউ আসে না। অযত্ন-অবহেলায় এটি পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।

মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে মুক্ত সংস্কৃতির এই মঞ্চ থেকে হারিয়ে গেছে নাচ, গান আর মঞ্চ নাটক।

এই মঞ্চে ২০১০ সালের দিকে সবশেষ অনুষ্ঠান হয়েছে। এরপর অযত্ন-অবহেলায় ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে ‘মুক্ত মঞ্চ’টি। সেই থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছে গুরুদাসপুরের সংস্কৃতি চর্চাও।

মুক্ত মঞ্চটি গুরুদাসপুর পৌর সদরের ব্যস্ততম চাঁচকৈড় পুড়াতন গরু হাট এলাকায় অবস্থিত।

স্থানীয় নাট্য ও কণ্ঠ শিল্পীরা জানিয়েছেন, ‘নবকুঁড়ি নাট্য সংস্থা’ ও ‘স্বরলিপি শিল্পী গোষ্ঠীর’ দাবির মুখে ১৯৯৩ সালে এই ‘মুক্ত মঞ্চ’টি নির্মাণ করেন বিএনপি নেতা পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বাবলু। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত শহীদদের স্বরণে ‘মুক্ত মঞ্চে’র ভবনে লাল হরফে লেখা হয় ‘যাদের রক্তে স্বাধীন এ দেশ’। তখন থেকেই গুরুদাসপুরসহ আশপাশের তাড়াশ, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া উপজেলা এলাকার সংস্কৃতি প্রেমীদের আনাগোনা বাড়ে এই ‘মুক্ত মঞ্চে’। আশপাশে গড়ে ওঠে চাঁচকৈড় কিশোর সঙ্গীত একাডেমী, রজনীগন্ধা নাট্য সংস্থা, গুরুদাসপুর শিল্পকলা একাডেমী, লালন পরিষদের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ‘মুক্ত মঞ্চে’ উৎসব মুখর পরিবেশে নাচ, গান আর মঞ্চ নাটক আয়োজন করতো এসব প্রতিষ্ঠান। মাঝে মাঝে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানও ঠাঁই পেত।

নবকুঁড়ি নাট্য সংস্থার সভাপতি আলী আক্কাছ বলেন, স্থানীয়দের দাবির মুখেই নব্বই দশকে ‘মুক্ত মঞ্চ’ নির্মাণ করা হয়। ‘ঘাটের মরা’ মঞ্চায়িত হওয়ার মাধ্যমে মুক্ত মঞ্চের যাত্রা শুরু হয়। এরপর এই মঞ্চে একে একে মঞ্চায়িত হয় নাটক ‘সম্রাট বাহাদুর শাহ, টাকার দোষ, বাঁচতে চাই, চেয়ারম্যান, সতর্ক হোন, এ লাশ খবরে থাকবে না’। এসব নাটক এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল হলেও প্রতি মাসেই ‘মুক্ত মঞ্চে’ নাটক দেখতে ভিড় জমাতেন সাংস্কৃতি প্রেমীরা। নতুন অনেক লেখক নাটক, গান, কবিতা, ছড়া লেখা শুরু করেন।

স্বরলিপি শিল্পী গোষ্ঠির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রথম একদশকে স্থানীয় শিল্পীরা মুক্ত মঞ্চকে ঘিরে সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাব, বহিরাগত শিল্পী এনে অনুষ্ঠান আয়োজন, স্থানীয় শিল্পীদের অবমূল্যায়ণসহ নানা কারণে ‘মুক্ত মঞ্চ’ বিমুখ হয়ে পড়েন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ২০০৭-২০০৮ সাল নাগাদও মুক্ত মঞ্চে নাটক, গান বাজনা আর নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে অবহেলায় মুক্ত মঞ্চটি সক্রিয়তা হারিয়েছে। মুক্ত মঞ্চ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে সব ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

লাল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ বলেন, মুক্ত মঞ্চের আশপাশজুড়ে এখন স্থায়ী-অস্থায়ী টয়লেট আর ময়লার ভাগাড়। দুর্গন্ধে নাকাল স্থানীয়রা। মুক্ত মঞ্চ ভবনের তিনটি রুমই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সংস্কার করে মঞ্চটি সাংস্কৃতিক পরিবেশনার উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন বিএনপির এই নেতা।

বেশ কিছু মঞ্চ নাটকের রচিয়তা শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, মুক্ত মঞ্চে আমার লেখা বেশ কিছু নাটক মঞ্চায়িত হয়েছিল। তবে এর কার্যক্রম বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চ নাটক লেখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি।

পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মশিউর রহমান বাবলু বলেন, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় শিল্পীদের দাবির মুখে ‘মুক্ত মঞ্চ’টি নির্মাণ করেছিলাম। এই মঞ্চটি উৎসব মুখর হয়ে থাকতো স্থানীয় শিল্পীদের নানা আয়োজনে। অথচ সেই মুক্ত মঞ্চটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এলাকার সাংস্কৃতিক চর্চা ফিরিয়ে আনতে মুক্ত মঞ্চটিকে রক্ষা করতে হবে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, গুরুদাসপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুক্ত মঞ্চের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। খুব দ্রুত মঞ্চটি সংস্কার করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবো।