নির্বাচন বাধাগ্রস্থ করার নেপথ্যের কারণ 

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র থেমে নেই। নানাভাবে নির্বাচন বন্ধের জন্য চক্রান্ত এখনো চলমান রয়েছে। একটি অদৃশ্য শক্তি নির্বাচন নিয়ে খেলাধুলা শুরু করেছে। সেই অদৃশ্য শক্তি কারা এবং কিসের স্বার্থে নির্বাচন বন্ধের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে? কেন সেই শক্তি নির্বাচন চায় না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীণ অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়নের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। 

বর্তমান সরকারের একমাত্র রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। কারণ এই এনসিপির দুইজন প্রতিনিধি সরাসরি বর্তমান সরকারে আছেন। এছাড়াও পরোক্ষভাবে এই সরকারের উপর প্রবল প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে আছে দলটির অনুগত আমলারা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও তাদের প্রভাব বিদ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদগুলোও বাগিয়ে নিয়েছে দলটি। সরকারের উপর প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির। এক অর্থে সরকার পরিচালনা করছে ওই দু’টি রাজনৈতিক দল। 

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কেন জামায়াত, এনসিপি বা তাদের সাথে যোগ দেয়া বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনের পথে যাবে? নির্বাচন ছাড়াই তো তারা সরকার পরিচালনা করছে, তাহলে নিজের ক্ষতি করে তারা কেন নির্বাচন দেবে? কেননা ভোট হলে জামায়াত, এনসিপি বা ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব ভালো করে জানে যে, জনগণের ভোটে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এই ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করতে তিনটি রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে নির্বাচন আয়োজনকে বাঁধাগ্রস্থ করতে নানা দাবি সামনে এনে বিভিন্ন ধরণের তৎপরতা শুরু করেছে। 

চলতি বছরের ১৩জুন প্রধান উপদেষ্টা এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের সাথে ঐতিহাসিক বৈঠকের পর থেকে বাংলাদেশে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়। কিন্তু সেই বৈঠকে সরকার এবং বিএনপির যৌথ ঘোষণার পর থেকে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত, এনসিপি বা ইসলামী আন্দোলন। তাদের অভিযোগ একটি দলের সাথে আলোচনা করে নির্বাচনের সিদ্ধান্তের কথা বলে এসেছে। যদিও সেই বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে কোন কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। কিন্তু ওই বৈঠকের পর থেকে তিনটি রাজনৈতিক দল পিআর (সংখ্যানুপাতিক) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। পিআর পদ্ধতি ছাড়া তারা দেশে নির্বাচন হতে দেবে না বলেও ঘোষণা দেয়। 

চলতি বছরের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দেন যে, আগামী রমজানের আগে ফেব্রুয়ারি মাসেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে পত্র দেয়ারও ঘোষণা দেন। মানসিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বলে জানান। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা মোতাবেক ৬ আগস্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের জন্য পত্র দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশনও সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্টই জানিয়েছেন ফেব্রুয়ারি প্রথমার্ধে তারা জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুত। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তপশিল ঘোষণা করবেন। আগামী অক্টোবরের মধ্যে সব ধরণের নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ করে ফেলবেন।

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণাকে স্বাগত জানান। ‘কিন্তু’ রেখে জামায়াত, এনসিপি বা ইসলামী আন্দোলনের স্বাগত ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের গন্ধ আরো ডালপালা গজিয়েছে। সম্প্রতি তিনটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়গুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারি ঘোষণা দেন, ফেব্রুয়ারিতে দেশে কোন নির্বাচন হবে না। তার এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া গেছে দলটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের আলোচনাও। তারাও বলছেন, জুলাই সনদ ছাড়া নির্বাচন হবে না। নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বেশকিছু দাবিদফা উপস্থাপন করে এসেছে। দেশে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আব্দুুস সালাম বলেছেন, নির্বাচন শুধু বিএনপির স্বার্থের জন্য না, এটি দেশরক্ষার নির্বাচন, স্বাধীনতা রক্ষার নির্বাচন, গণতন্ত্র রক্ষা এবং ফিরিয়ে আনার জন্য নির্বাচন। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম’র চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেছেন, নির্বাচন ছাড়া ‘সংস্কার’ কোন সংস্কার নয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য আমির খসরু মাহমুদ বলেছেন, নির্বাচনের খবর ছড়িয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

এদিকে নির্বাচন নিয়ে স্বস্তির খবর আবার অন্যদিকে আছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। এই পরিস্থিতিতে কি আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে? এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের একটি বক্তব্য সামনে এসেছে। তিনি বলেছেন, "আগামীর নির্বাচন খুব সহজ হবে না কারণ একটি অদৃশ্য শক্তি ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আগামীর নির্বাচন সবচেয়ে কঠিন হবে। এ নির্বাচন ঘিরে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তবে জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জন করা গেলে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।" যদিও সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালাহউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, কোন ব্যক্তি বা দলের কথায় নির্বাচন বন্ধ হবে না। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা দেশকে স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার পথে ফিরিয়ে আনতে পারবো। 

সবকিছু ছাপিয়ে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন ছাড়া অস্বাভাবিকভাবে এভাবে একটি সরকার কতদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে? কেন নির্বাচন এলে বারবার চক্রান্ত হয়? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা ভোট, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ডামি ভোট নিয়ে জাতির সামনে নাটক মঞ্চায়ন করে আজ জনগণ কর্তৃক ধিক্কৃত হয়েছে বিগত ফ্যাসিবাদ সরকার। কোন রাজনৈতিক দল যদি জনগণের ভোটকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় অনির্বাচিত সরকার দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে চায় তাহলে তাদের ভীতরেও ফ্যাসিবাদী মনোভাব তৈরি হবে। 

রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা দরকার নির্বাচন হলো বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সংস্কার। সেই সংস্কার আটকানো হবে নতুন ফ্যাসিবাদী চিন্তা। যেসব রাজনৈতিব দল সংস্কার বা নানা দাবিতে নির্বাচন বাধাগ্রস্থ করতে চাচ্ছে তাদের কারণে যদি আগামী ফেব্রুয়ারিতে সরকার ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব না হয় তাহলে বাংলাদেশ গভীর খাদে পড়বে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান বিফলে যাবে। ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে দেশে। স্বরুপে ফিরে আসবে ফ্যাসিবাদ। বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে নির্বাচন বাধাগ্রস্থকারী রাজনৈতিক দলগুলো। জুলাই-আগস্ট স্বপক্ষের শক্তিগুলো এভাবে বিভক্তির ভীতরে নিজেদের আটকে রাখলে পরিণাম ভালো হবে না। 

নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে-এই মানসিকতা আপাতত পরিহার করতে হবে। নির্বাচন আদায়ে বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীকে সহনশীল আচরণ করে মাঠে সক্রিয় থাকতে হবে। জনগণের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। যে কোন মূল্যে বাংলাদেশে নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচন ছাড়া দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা কখনোই ফিরে আসবে না। এজন্য নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করতে সবার আগে জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। দেশ নিয়ে কোন শক্তি যেন ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এই দেশ আমার, আপনার তথা সবার।  

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।