বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। দেশে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সে লক্ষ্যে তারা প্রস্তুতি চালিয়ে যান। স্কলারশিপ বা বৃত্তির মাধ্যমে কেউ কেউ প্রায় বিনাখরচেই সেই সুযোগ পান, আবার আর্থিকভাবে সচ্ছল অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা পরিবারের সহায়তা নিয়েই বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। যদিও এক্ষেত্রে অধিকাংশ পরিবার মনে করেন, বিদেশে স্থায়ী হওয়া মানেই যেন নিরাপদ ভবিষ্যৎ, আধুনিক জীবনযাপন এবং উচ্চবেতনে চাকরির নিশ্চয়তা।
তবে এর উল্টো স্রোতও কিন্তু আছে। বিদেশে গিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসাও এখন অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। দেশ, সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা তাদের ফিরিয়ে আনে নিজভূমে। অবশ্য দেশে চাকরিরত কেউ যখন নিজের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি নিতে বিদেশে যান, ফিরে এসে তাকে খুব একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় না। তবে যারা কোনো চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই বিদেশে পাড়ি দেন, দেশের বাস্তবতায় ফিরে এসে ক্যারিয়ার গড়া বেশ কঠিন হয় বৈকি। কারণ উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে এলেও, প্রায়শই কাঙ্ক্ষিত সুযোগের অভাব দেখা দেয়।
বাংলাদেশের চাকরি বাজার এখনো অনেকাংশে প্রচলিত ধারা ও সম্পর্কভিত্তিক। আবার বিদেশি ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই সরকারি চাকরির সীমিত বা নির্ধারিত কাঠামোর কারণে পাবলিক সেক্টরে কাজের সুযোগ পান না। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে যেসব চাকরি মেলে, সেখানে স্কোপ অব ওয়ার্ক, স্কিলসেট, ডিগ্রি, জব ডেসক্রিপশন এবং স্যালারির অন্তর্দ্বন্দ্বও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ব্রেন ড্রেন’ বনাম ‘ব্রেন গেইন’ প্রসঙ্গ উঠে আসে। কেউ কেউ বিদেশেই থেকে যান স্থায়ীভাবে, কারণ ওই যে বললাম-দেশে ফেরার পর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার যারা দেশে ফেরেন, তাদের অনেকেই সেখানকার অভ্যাস আর দেশের বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে হিমশিম খান। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া তখন কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক খাতের সুযোগ-সুবিধা এখনো সীমিত। যারা বিদেশে ফলিত বিষয়ে গবেষণা-নির্ভর পড়াশোনা করেন, দেশে এসে ফান্ডিং এবং নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সেভাবে কাজ করতে পারেন না। ফলে তাদের মেধার সঠিক ব্যবহার হয় না। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও কম চ্যালেঞ্জ নয়। বিদেশে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা দেশে ফিরে কর্মসংস্কৃতিতে মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়েন। সময় ব্যবস্থাপনায় শিথিলতা, স্বচ্ছতার অভাব কিংবা পেশাগত দ্বন্দ্বের রাজনীতি—এসব বিষয় তাদের ক্যারিয়ার গড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে লেখাটি এ পর্যন্ত পড়ার পর মনে হতে পারে, হতাশার পাল্লাই বোধহয় ভারী। কিন্তু না, দেশে ফেরার পর যারা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেন, নতুন স্টার্টআপ বা কনসালট্যান্সি চালু করেন; কিংবা গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হন, তাদের অনেকেই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হন। খুঁজলে এমন অসংখ্য উদাহরণ পাবেন! এছাড়া উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা অনেক সময় উন্নয়ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিও, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অনেককে বাড়তি গুরুত্ব এনে দেয়।
মাথায় রাখতে হবে, বিদেশে পড়াশোনা করতে চাওয়া এবং পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার ইচ্ছা থাকলে, প্রথমেই সামগ্রিক পরিকল্পনা করা জরুরি। কোন খাতে কাজ করবেন, শুরুতেই তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে একাধিক ‘অপশন’ রাখুন। একই সাথে নেটওয়ার্ক তৈরি করা, সফট স্কিল ও লোকাল কনটেক্সট বোঝা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা নিয়ে এগোনোর চেষ্টা দরকার। অন্য সবকিছুর চাইতে বেশি প্রয়োজন প্রয়োজন ধৈর্য ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কারণ দেশের সিস্টেমকে বুঝে ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করাই হয়ে উঠবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।