নরসিংদী জেলায় জমে উঠেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে এবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রধান লড়াই হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এছাড়াও মাঠে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, এনসিপিসহ অন্য দলের প্রার্থীরা। তরুণ ভোটারদের সক্রিয় উপস্থিতি এ নির্বাচনে বাড়িয়েছে অতিরিক্ত মাত্রা। তবে এনসিপি এ আসনে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।
জেলার আসনগুলোর মধ্যে নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনটি বাদে বাকি চারটি আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জামায়াতও তাদের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে তৎপরতা শুরু করেছে সর্বশক্তি নিয়ে।
তবে বিগত নির্বাচনগুলোতে জামায়াত নরসিংদীর কোনো আসন থেকেই জয়লাভ করতে পারেনি। এনসিপি, এলডিপি, গণঅধিকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিশসহ অন্য দলের প্রার্থীরাও বেশির ভাগ আসনেই তৎপরতা চালাচ্ছেন।
নরসিংদী-১ (সদর): এ আসনে স্বাধীনতার পর থেকে পালাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিজয়ী হলেও এবার মাঠে নেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের। জাতীয় পার্টিরও (জাপা) কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
এ আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব, সদরের সাবেক এমপি, নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন। দীর্ঘদিন তৃণমূলের পাশে থাকার অভিজ্ঞতাই তার মূলশক্তি বলে মনে করছেন সমর্থকরা।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. ইব্রাহিম ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা শওকত হোসাইন সরকার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাহমুদুল হক ভূঁইয়া।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রয়াত মেজর সামসুল হুদা বাচ্চু, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামাল বেবি, ১৯৯১, ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারি ও ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে বিএনপি থেকে সামসুদ্দীন আহমেদ এছাক এমপি নির্বাচিত হন।
২০০৫-এর উপনির্বাচনে খায়রুল কবির খোকন বিএনপি প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮, এবং ২০২৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে লে. কর্নেল (অব) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু (বীর প্রতীক) এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
নরসিংদী-২ (পলাশ): এ আসন থেকে ২৬-এর নির্বাচনে লড়ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল মঈন খান। এ আসনে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি উপাধ্যক্ষ মো. আমজাদ হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ার মহসিন আহমেদ, খেলাফত মজলিশের মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জামিল।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে দৈনিক সংবাদের প্রধান সম্পাদক, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ প্রয়াত আহমেদুল কবির মনু মিয়া এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মো. দেলোয়ার হোসেন খান এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডাক্তার আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে দিলীপের ছোটভাই আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল আশরাফ খান পোটন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পুনরায় আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
নরসিংদী-৩ (শিবপুর): কৌশলগত কারণে এ আসনে বিএনপি এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে এখানে বিএনপির শরীকদল গণফোরামের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিকের নামও শোনা যাচ্ছে। এখানে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর এলাহী, জেলা বিএনপির সহসভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার কালামিয়া ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু।
তবে বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার স্মৃতি ধরে রাখতে এ আসন থেকে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক, শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আরিফ-উল-ইসলাম মৃধা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানা গেছে। এ আসনে জামায়াতের ইসলামীর প্রার্থী হচ্ছেন মোস্তাফিজুর রহমান কাউছার।
এ আসনটি একসময় বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া ধানের শীষের পরিবর্তে হাঁস মার্কা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহনের কাছে পরাজিত হন। এর পর থেকে এ আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যায়। এর আগে ১৯৮৬ সালে ১৪ দলীয় জোটের কামাল হায়দার এবং ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির শাহজাহান সাজু এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এরপর ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এবং পরবর্তীতে পুনরায় ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮-এ আওয়ামী লীগের জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন এবং ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের সিরাজুল ইসলাম মোল্লা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহনকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালেও জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে সিরাজুল ইসলাম মোল্লা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোহনকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন।
নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাব): এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হচ্ছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। এর আগে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রয়াত অ্যাড. নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন।
১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া এবং উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির এ এইচ এম আব্দুল হালিম এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বিএনপির সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনেও তিনি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে সাবেক সেনা প্রধান নুরউদ্দীন খান এমপি নির্বাচিত হন।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এমপি নির্বাচিত হন। এরপর থেকে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টিকিটে প্রয়াত নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এমপি নির্বাচিত হন।
নরসিংদী-৫ (রায়পুরা): এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞাপন ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহসম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম, ইসলামী আন্দোলনের মো. বদরুজ্জামান।
এ আসনে ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুল হক খসরু, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মাঈন উদ্দিন ভূঁইয়া, ১৯৯১ সালে বিএনপির আবদুল আলী মৃধা এবং ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আবদুল আলী মৃধা এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু এমপি নির্বাচিত হন। পরে একাধারে ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে সংসদ নির্বাচনে রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নবম সংসদ নির্বাচনে নরসিংদীর পাঁচটি আসনের সবকয়টিতেই জয় পায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এর আগে ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে নরসিংদীর পাঁচটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করেন।