ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে বিধিনিষেধ

তীব্র পানিসংকটে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ; বরেন্দ্র অঞ্চলের এ তিন জেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে ‘পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। এ অঞ্চলের প্রায় ৮৭ হাজার মানুষ সরাসরি তীব্র পানিসংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সরকারি গেজেটে কেবল খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ১০ বছরের জন্য উল্লিখিত এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অর্থাৎ উল্লিখিত এলাকায় খাবারের পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না। সেচ কিংবা শিল্পকারখানায় আর গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা যাবে না। এ আদেশ লঙ্ঘন ‘পানি আইন-২০১৩’ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে। পানিসংকটের এক কঠিন বাস্তবতায় গত বছর ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করেছে সরকার। এতে প্রচণ্ড চাপে পড়েছে কৃষি ও ব্যবসা। তখন গ্রামের সাধারণ মানুষ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবেনি। আসন্ন বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে হতাশ স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে কৃষকদের সরবরাহ করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। এরপরও অত্র অঞ্চলের সমগ্র কৃষিজমিতে সেচ-সুবিধায় বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ সফল হয়নি। ব্যাপকহার বেসরকারি পানিবাণিজ্যে জড়িত গোষ্ঠীর স্থাপিত সাব-মার্সিবল পাম্পের সাহায্যে বরেন্দ্র ভূমির ভূগর্ভস্থ পানি নিরন্তর শুষে নেওয়া হচ্ছে। ফলে বরেন্দ্রভূমি আজ বিরানভূমির দোরগোড়ায়।

সূত্র মতে, সরকারি গেজেটের পর বিএমডিএ কর্মকর্তারাও অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হন। বিএমডিএর একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘বাংলাদেশে এভাবে কৃষিকাজ বন্ধ করা অসম্ভব।’ বিএমডিএর সদ্যবিদায়ি নির্বাহী পরিচালক মো. তরিকুল আলম বলেন, ‘আমরা গেজেট দেখেছি। গভীর নলকূপে শুধু খাবার পানি তোলা যাবে, কৃষিতেও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা যাবে না। উল্লিখিত এলাকায় গভীর নলকূপ সংখ্যা, জমির পরিমাণ, ফসলের শ্রেণির বিষয়ে মাঠপর্যায়ের তথ্য নিয়েছি। এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’

সূত্র মতে, গেজেটে ২৫ উপজেলার ২১৫ ইউনিয়নের বিশাল এলাকায় আগামী ১০ বছরের জন্য পানি সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা অতিউচ্চ, ৮৮৪টি উচ্চ এবং ১ হাজার ২৪০টি মধ্যম সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহত্তর রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, নওগাঁর পোরশা ও সাপাহার উপজেলার বহু ইউনিয়ন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮৫-৯০ পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল ২৬ ফুট নিচেই। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে ২০১০ সালে তা ৫০ ফুট, ২০২১ সালে ৬০ ফুটে নামে। এখন খুঁড়তে হচ্ছে ১১৩ ফুটের বেশি। বরেন্দ্রভূমি যেন মরুকরণে অগ্রসর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এসেছে ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় নিষেধাজ্ঞা।

গোদাগাড়ীর চৈতন্যপুরের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘কৃষিকাজ বন্ধ করে বসে থাকা কোনো সমাধান নয়, সম্ভবও নয়। সমস্যা সমাধানে বিকল্প খুঁজতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির যে গঠন, তাতে খুব সহজেই ভূউপরিস্থ পানির আধার তৈরি করা যাবে। নীতিনির্ধারকদের সে পথে হাঁটতে হবে।’

গেজেটে খাল-বিল-পুকুর ইজারা বন্ধ ও অধিক সেচের ফসলের চাষ সীমিতকরণে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘খাল, বিল, পুকুর, নদীর শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। জলাশয়া সাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না, কোনো জলাশয়ের সমগ্র পানি আহরণ করে নিঃশেষ করা যাবে না।’

বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শুধু খাওয়ার পানি তোলা যাবে। এতে দেখা যাবে বাড়িতে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে সেচের পানি দেওয়া হবে। এ অবস্থায় সংকট মোকাবিলায় ভূউপরিস্থ পানি নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। এজন্য পদ্মার পানি বরেন্দ্র অঞ্চলে নিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। সরকারি পুকুর, খাল-বিল ইজারার পরিবর্তে সেচের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এছাড়া কম সেচের বা বৃষ্টি নির্ভর ফসলের আবাদ বাড়াতে হবে।’