মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কোনো শক্তিশালী মাধ্যমের আবির্ভাব ঘটে নাই, যাহা একযোগে মঙ্গল এবং অমঙ্গলের সম্ভাবনা বহন করিয়াছে—যতখানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম করিতেছে । ইহা যেমন জ্ঞান, তথ্য, সচেতনতা ও জনমত গঠনের ক্ষেত্র—তেমনই ইহা গুজব, অপতথ্য, প্রতারণা এবং চরিত্রহননেরও ক্ষেত্র। ফলে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি অমূলক নহে । বরং ইহা একটি বাস্তব ও গুরুতর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব; কিন্তু সমস্যাটি অন্যত্র—‘ক্ষতিকর' বলিতে ঠিক কী বুঝায়?
একটি প্রাচীন প্রবাদে বলা হয়, অমঙ্গলকে ফুৎকারে উড়াইয়া দিতে যাইও না, কারণ তাহার সহিত মঙ্গলও উড়িয়া যাইতে পারে। রবীন্দ্রনাথও সতর্ক করিয়াছিলেন—‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?' অর্থ, মিথ্যাকে রোধ করিবার জন্য যদি সকল দ্বার বন্ধ করা হয়, তাহা হইলে সত্যও প্রবেশের পথ হারাইতে পারে। এই দুইটি বাণীর অন্তর্নিহিত শিক্ষা একটিই—জীবনের বাস্তবতা কখনো সাদা-কালো নহে । মঙ্গল ও অমঙ্গল, সত্য ও অসত্য, উপযোগিতা ও অপব্যবহার প্রায়শই একই ক্ষেত্রের মধ্যে সহাবস্থান করে । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্কেও এই সত্য প্রযোজ্য। ভুয়া ছবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রতারণা, নারী ও শিশুর প্রতি অনলাইন হয়রানি, পরিচয় জালিয়াতি কিংবা সংগঠিত অপপ্রচার—ইহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন; কিন্তু যেই মুহূর্তে রাষ্ট্র ঘোষণা করে যে, ‘ক্ষতিকর কনটেন্ট’ অপসারণ করা হইবে, সেই মুহূর্তেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয় : ক্ষতিকরের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করিবে? কারণ, ক্ষতিকর বলিয়া যাহা এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিবেচনা করে, অন্য ব্যক্তি তাহাকে মতপ্রকাশের বৈধ অধিকার বলিয়া মনে করিতে পারে । একজন আস্তিকের নিকট কোনো নাস্তিক্যবাদী বক্তব্য আপত্তিকর হইতে পারে, আবার নাস্তিকের নিকট ধর্মীয় প্রচারই ক্ষতিকর বলিয়া প্রতিভাত হইতে পারে । ডানপন্থির নিকট বামপন্থি মতবাদ বিপজ্জনক, বামপন্থির নিকট ডানপন্থি চিন্তা প্রতিক্রিয়াশীল ।
ক্ষমতাসীনদের নিকট কোনো সমালোচনা অযৌক্তিক বা বিদ্বেষমূলক বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু বিরোধী পক্ষ তাহাকে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় সমালোচনা বলিয়া দাবি করিতে পারে । এইখানেই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু । যদি ‘ক্ষতিকর’ শব্দটির স্পষ্ট, সংকীর্ণ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা না থাকে, তাহা হইলে ইহা এমন এক বিস্তৃত জালে পরিণত হইতে পারে, যাহার মধ্যে প্রকৃত অপরাধীর পাশাপাশি বৈধ মতপ্রকাশও ধরা পড়িবে।
আরো একটি বিষয় বিবেচ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমগুলির নিজস্ব নীতিমালা রহিয়াছে। সন্ত্রাসবাদ, শিশুনির্যাতন, প্রতারণা, সহিংসতার উসকানি, পরিচয় জালিয়াতি এবং বহু ধরনের ক্ষতিকর বিষয়বস্তু তাহারা নিয়মিত অপসারণ করিয়া থাকে। ব্যবহারকারীদের রিপোর্টের ভিত্তিতেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় । সুতরাং প্রশ্ন উঠিতে পারে—রাষ্ট্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কোথায় এবং তাহার সীমা কতখানি? রাষ্ট্রের দায়িত্ব অবশ্যই নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হইতে হয়। ‘অপমানজনক’, ‘বিভ্রান্তিকর' কিংবা ‘ক্ষতিকর’–এই জাতীয় শব্দগুলির ব্যাখ্যা যদি প্রশাসনিক বিবেচনার উপর নির্ভরশীল হয়, তাহা হইলে আইনের প্রয়োগ ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হইবার আশঙ্কা থাকে। আইন তখন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নহে, বরং অনিশ্চয়তার উৎসে পরিণত হয়। সাইবার জগতের বাস্তব বিপদ মোকাবিলা করিতে হইবে নিঃসন্দেহে; কিন্তু তাহার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বাধীন পর্যালোচনাপদ্ধতি এবং ন্যায্য আপিলের সুযোগ । অন্যথায়, গুজব দমনের নামে সমালোচনা, অপপ্রচার ঠেকানোর নামে ভিন্নমত এবং ক্ষতিকর বিষয়বস্তু অপসারণের নামে বৈধ মতপ্রকাশও বিপন্ন হইতে পারে ।
খনি হইতে সোনা আহরণ করিতে গেলে যেমন মাটি, পাথর ও অন্যান্য খনিজের মধ্য হইতে সতর্কতার সহিত তাহা পৃথক করিতে হয়, তেমনি ডিজিটাল জগতেও অমঙ্গল দূর করিবার প্রয়াসে মঙ্গলকে ধ্বংস করা চলিবে না । কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম যত প্রয়োজনীয়, সত্যের প্রবেশদ্বার খোলা রাখাও ততটাই প্রয়োজনীয়। আর সেই ভারসাম্য রক্ষার মধ্যেই একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রজ্ঞা নিহিত থাকে ।