কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবিত ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের তরুণ পেশাজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত করা যায়—সে বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে গত ৩ জুন একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘নৈতিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা: শিক্ষা–শিল্প সংলাপ’ শীর্ষক এই আয়োজনের উদ্যোগ নেয় ‘দ্য এআই কালেকটিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ সপ্তাহ-এর অংশ হিসেবে বৈঠকটি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এ অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন ড. মুহাম্মদ ফিরোজ মৃধা, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (আন্ডার গ্র্যাজুয়েট), সিএসই বিভাগ, এআইইউবি। তিনি জোর দেন শক্তিশালী মৌলিক জ্ঞান এবং বাস্তব এআই অভিজ্ঞতার সমন্বয়ের ওপর। তিনি শিক্ষার্থীদের এআই-কে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান, যাতে এটি বোঝাপড়ার বিকল্প না হয়ে শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে তিনি গবেষণামুখী সংস্কৃতি, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
দ্য এআই কালেকটিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার-এর চ্যাপ্টার লিড মোহাম্মদ আসিফ বলেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির পরও এর সুফল এখনো বিশ্বজুড়ে সমভাবে পৌঁছায়নি। বিশ্বের অল্পসংখ্যক মানুষ উন্নত এআই প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করলেও অধিকাংশ মানুষ এখনো এআই-এর সঙ্গে অর্থবহভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেনি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চীফ মেজর জেনারেল ইবনে ফজল শায়েখুজ্জামান (অব.) এআই ও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে কোনো প্রযুক্তিই প্রকৃত অর্থে বিনামূল্যে নয়। মানুষ যখন বিনামূল্যের এআই টুল ব্যবহার করে, তখন তাদের তথ্য ও আচরণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়; অর্থাৎ ব্যবহারকারীরাই পণ্যে পরিণত হন। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সাধারণত উত্থান, অস্থিরতা এবং পুনরুদ্ধারের একটি ঐতিহাসিক ধারা অনুসরণ করে, এবং এআই-ও সম্ভবত একই পথ অনুসরণ করবে। তিনি এআই ব্যবহারের সুশাসন এবং তথ্য সুরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী এআই নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এআইইউবি-এর ফ্যাকাল্টি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর ডিন প্রফেসর ড. দীপ নন্দী জানান যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে তাদের পাঠ্যক্রমে এআই অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করছে। তবে তিনি শিক্ষার্থীদের এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ডাটা বিশ্লেষণের সক্ষমতা অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। তিনি শিল্পখাতের প্রতিনিধিদেরও নিয়মিত মতামত ও দিকনির্দেশনা প্রদানের আহ্বান জানান, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্প-উপযোগী দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারে।
হুয়াওয়ে টেকনোলজিস-এর অপারেশনাল ডিরেক্টর মাহফুজ কায়সার আপু শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে সবকিছু শেখার পরিবর্তে এআই-এর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে গভীর দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দেন। তিনি মনে করেন, এআই দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়া উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শুরু হওয়া উচিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। তিনি সরকার-সমর্থিত এআই-সমন্বিত শিক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
এআইইউবি-এর গ্রাজুয়েট প্রোগ্রামের প্রধান ড. তাবিন হাসান এআই-কে আরও মানবকেন্দ্রিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী উদাহরণ তুলে ধরেন: একটি ঘোড়া স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে চায়, কিন্তু একটি স্বয়ংচালিত গাড়িকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয় যাতে তা মানুষের জীবন রক্ষা করে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এবং যন্ত্রের প্রোগ্রামিংয়ের এই পার্থক্যই প্রমাণ করে যে এআই সিস্টেমকে অবশ্যই মানুষকে কেন্দ্র করে ডিজাইন করতে হবে। তিনি বলেন, মানুষ তখনই এআই-এর প্রতি আস্থা তৈরি করবে যখন তারা সহজে এটি ব্যবহার করতে পারবে এবং এর বাস্তব উপকারিতা অনুভব করবে।
এসিআই এআই বিজনেস, এসিআই পিএলসি-এর ডিরেক্টর ও সিওও মোহাম্মদ ওলি আহাদ বলেন, এআই-এর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্র এখনো মানুষের স্বাভাবিক সক্ষমতার সমকক্ষ হতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি মানুষের হাতের মতো সংবেদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতা নিয়ে কোনো বস্তুকে ধরার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তার মতে, এআই-এর উন্নয়ন অবশ্যই মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তিনি শিশুদের এআই ব্যবহার থেকে বিরত রাখার পরিবর্তে তাদের এআই-এর দায়িত্বশীল, সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার শেখানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি শিক্ষকদের শিল্পখাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে তারা আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
এআইইউবি-এর ড. মো. সাইফ উল্লাহ মিয়া বলেন, অনেক শিক্ষার্থী এখনো এআই কার্যকর ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখেনি। তিনি উল্লেখ করেন, এআই যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হলো সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং এআই-এর দেওয়া উত্তরকে সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করার দক্ষতা। তিনি এআই-সমন্বিত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পক্ষে মত দেন, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণী সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি এআই ব্যবহারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, উপযুক্ত সুশাসন কাঠামো এবং তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
সমাপনী বক্তব্যে প্রাইম নাও-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, ডেটা সায়েন্স ও এআই খ. এহসানুর রহমান বলেন, এআই-কে শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত টুল হিসেবে নয়, বরং মানব অগ্রগতির একটি মানবকেন্দ্রিক সক্ষমতাবর্ধক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন যে এআই-এর উন্নয়ন ও ব্যবহার এমনভাবে হওয়া প্রয়োজন, যা মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, জনআস্থা রক্ষা করে এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যৎকে ‘এআই বনাম মানুষ’ হিসেবে দেখার পরিবর্তে মানুষ ও এআই-এর দায়িত্বশীল সহযোগিতা হিসেবে দেখা উচিত, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের পথকে শক্তিশালী করবে।
গোলটেবিল বৈঠকটি একটি অভিন্ন মতৈক্যের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়: বাংলাদেশের কাছে এআই-প্রস্তুত কর্মশক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মেধা ও সম্ভাবনা উভয়ই রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সময়োপযোগী পদক্ষেপ, নৈতিক নেতৃত্ব, কার্যকর সুশাসন এবং সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অপরিহার্য।