‘আটডা বার ঘর তুইললাম, পদ্মা সব লইয়া গেল’

ধবধবে সাদা চুল-দাঁড়ি। বয়সের ভার ও বলিরেখার ছাপ স্পষ্ট চোখ-কপালসহ পুরো মুখজুড়ে। জীবনের শেষ সায়াহেৃ এসেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ঘুরছেন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। প্রায় নব্বই বছর বয়সী হাসমত বেপারি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জানালেন, গত কয়েক দশকে গত কয়েক দশকে সাতবার তার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এবারও পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়ে স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর ছেড়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে ভাড়া বাসায়।

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা হাসমত বেপারী এখন স্ত্রী, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। তার ছেলে সৌদি আরবে প্রবাসী। অথচ নিজের শেষ বয়সে মাথা গোঁজার স্থায়ী কোনো ঠাঁই নেই এই বৃদ্ধের। চোখের সামনে ভেঙে যেতে দেখেছেন নিজের হাতে গড়া বাড়ি, আবাদি জমি আর বহু বছরের স্মৃতি।

কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে হাসমত বেপারী বলেন,

‘জীবনে আটডা বার ঘর তুইললাম, আটডা বারই পদ্দা সব লইয়া গেল। এই বয়সে আইয়া আর নতুন কইরা ঘর-দুয়ার করার জোর নাই। উপায় না দেইখা ভাড়া বাসায় উঠছি। জানি না, শেষ বয়সে নিজের একখান ঘরে মইরা যাইতে পারমু কি না।’

হাসমত বেপারীর একা নয়; তার মতো এমন বিষাদময় স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে সদরপুর উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকার অসংখ্য মানুষের। প্রতি বছরই নদীভাঙনের ভিটে-মাটি হারায় এই অঞ্চলের শত শত পরিবার। পানি বাড়লেই বাড়ে আতঙ্ক, কাটে নির্ঘুম রাত। নদী গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে অনেক পরিবারকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

বর্তমানে উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী, বেপারীডাঙ্গী এবং আকোটেরচর ইউনিয়নের ছলেনামা ও আকোট গ্রামে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আকোট জনসংঘ উচ্চ বিদ্যালয়, আশ্রয়ণ ও গুচ্ছগ্রাম, ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিয়াজখালী বাজার ও আকোট গুচ্ছগ্রামসহ প্রায় ১০ টি গ্রাম। 
 
স্থানীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।

তারা জানান, কয়েকদিন ধরে পদ্মার তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।

তারা দ্রুত ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে আকোটের চর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসলাম বেপারী জানান, ভাঙনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।  

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুনাহার জানান, আমরা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম চলাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেছি। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকার পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন জানান, পদ্মা নদীর ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকার পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।