ক্লাস রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা কেন প্রয়োজন

গতকাল ইত্তেফাকের একটি খবরের শিরোনাম ছিল : 'স্কুল-কলেজের সব ক্লাস রুমে বসছে সিসিটিভি ক্যামেরা।' এই খবরে বলা হইয়াছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি যাহাতে সঠিকভাবে মনিটরিং করা যায়, সেই জন্য বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের প্রতিটি ক্লাস রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়াছে সরকার। এই ব্যবস্থার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা কমিয়া আসিবে বলিয়া আশা করা হইতেছে। কেননা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সাইয়েন্সেস প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। তাহা ছাড়া ইহার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান করা হইতেছে কি না, তাহাও নজরে আনা সম্ভব হইবে। এইখানে দ্বিতীয় কারণটি আমাদের নিকট অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশে শিক্ষার মানের অবনতির মূল কারণ ক্লাসে ঠিকমতো না পড়ানো। প্রাণবন্ত ক্লাস রুমের অভাবে শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞানার্জন হইতে বঞ্চিত হইতেছে। অভিযোগ রহিয়াছে যে, ইহা করা হইতেছে অনেকটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে, যাহাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়িতে বাধ্য হয়। ইহা শিক্ষা-বাণিজ্যেরই অংশ এবং একশ্রেণির শিক্ষকের ভয়াবহ অনৈতিকতা, যাহা দেশ ও জাতি গঠনে প্রতিবন্ধক।

উপরিউক্ত বিবেচনায় এই খবরটি আশাব্যঞ্জক। সকল স্কুল-কলেজের প্রতিটি ক্লাস রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হইলে তাহা হইবে এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। দুঃখজনক হইলেও সত্য, আমাদের দেশের একশ্রেণির শিক্ষক ক্লাস রুমে পাঠদানের পবিত্র দায়িত্বকে অবহেলা করিয়া থাকেন। ইহাকে কেবল ফাঁকিবাজি বলিলে ভুল হইবে, ইহা মূলত একপ্রকার সুসংগঠিত অনৈতিকতা ও সিন্ডিকেটেড ক্রাইম বা সংঘবদ্ধ অপরাধ। ক্লাস রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হইলে শিক্ষকদের এই উদ্দেশ্যমূলক ফাঁকিবাজি এবং শ্রেণিকক্ষে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন ব্যবহারে মগ্ন থাকার ন্যায় অপসংস্কৃতিও বহুলাংশে হ্রাস পাইবে। যখন শিক্ষকেরা জানিবেন যে তাহাদের প্রতিটি মুহূর্ত ও পাঠদানের গুণমান সরাসরি নজরদারির আওতায় রহিয়াছে, তখন তাহারা ক্লাসে ফাঁকি দিবার সাহস পাইবেন না।

বিশ্বের বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করিতে সিসিটিভি প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ রহিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯১ শতাংশ পাবলিক স্কুলে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্য, চীন, সিংগাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকার বহু বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ ও বারান্দা সিসিটিভির আওতাভুক্ত। যদিও উন্নত দেশসমূহে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) রক্ষার খাতিরে ক্লাস রুমের অভ্যন্তরে সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষেত্রে কিছু আইনি নিয়মকানুন ও বিধিনিষেধ রহিয়াছে, তথাপি শৃঙ্খলা রক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রচণ্ড অভাব রহিয়াছে, সেখানে এই ব্যবস্থা প্রবর্তন সময়ের দাবি।

তবে কেবল সিসিটিভি ক্যামেরা বসাইলেই শিক্ষকদের সম্পূর্ণ দায়িত্বশীল করা সম্ভব নহে; ইহার জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত নীতিমালা। শিক্ষকদের ফাঁকিবাজি রোধে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য প্রতিটি উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসে একটি করিয়া ‘কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল' গঠন করিতে হইবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এই ফুটেজ দৈনিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করিয়া অবহেলার প্রমাণ পাইলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি ভালো ও দায়িত্ববান শিক্ষকদের পুরস্কৃত করা এবং ফাঁকিবাজদের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত বা চাকরিচ্যুতির ন্যায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখা আবশ্যক। ইহার সহিত প্রাইভেট স্কুল-কলেজে মানসম্মত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগসহ তাহারা পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা পান কি না, তাহারও খবর লইতে হইবে।

উপর্যুক্ত কারণে স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষকেও কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনিতে হইবে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দুর্নীতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধানে প্রতি তিন মাস অন্তর সরকারি পরিদর্শকদের দ্বারা সিসিটিভি রিপোর্টের অডিট করিতে হইবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি অকার্যকর থাকিলে বা মনিটরিংয়ে গাফিলতি পরিলক্ষিত হইলে, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পরিচালনা পর্ষদকে সরাসরি দায়ী করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, এমনকি প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের এমপিও (MPO) ভুক্তি বা সরকারি অনুদান স্থগিত করিবার মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

শিক্ষা কোনো বাণিজ্য নহে, ইহা একটি জাতির মেরুদণ্ড। একশ্রেণির অনৈতিক শিক্ষকের লোভ ও ফাঁকিবাজির বলি হইয়া আমাদের সন্তানরা শিক্ষাবিমুখ হইবে কিংবা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অযৌক্তিক চাপের মধ্যে থাকিবে— তাহা কোনোভাবেই কাম্য নহে। তাই সরকারের এই সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই।