আবহাওয়া অধিদপ্তরের ডপলার রাডার-সংকট

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৭

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ চিরকালই প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম চারণভূমি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা আকস্মিক বজ্রপাত—প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের পূর্বাভাস পাইবার একমাত্র আধুনিক সম্বল হইল ডপলার রাডার; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি ডপলার রাডারের সকলই বর্তমানে অকেজো হইয়া পড়িয়াছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘শেষ ডপলার রাডারটিও অকেজো, আবহাওয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য মিলছে না' শীর্ষক প্রতিবেদনটি আমাদের এই চরম ও ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত এই রাডারসমূহের অচলাবস্থায় আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তর আজ একপ্রকার অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না।

উল্লেখ্য, ঢাকা, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, রংপুর ও মৌলভীবাজারে স্থাপিত পাঁচটি রাডারের মধ্যে তিনটি দীর্ঘদিন ধরিয়া সম্পূর্ণ অচল এবং অবশিষ্ট দুইটিও কারিগরি ত্রুটির কারণে অকেজো হইয়া পড়িয়াছে। রংপুরের রাডারটি গত ১৭ জুন হইতে এবং ঢাকার রাডারটি গত শনিবার হইতে বন্ধ রহিয়াছে। ইহাতে পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়াগত তথ্য পাওয়া যাইতেছে না। বাধ্য হইয়া অন্যান্য সংস্থা বিশেষত বিমান বাহিনীর রাডার ও উপগ্রহচিত্রের উপর নির্ভর করিয়া পূর্বাভাস দেওয়া হইতেছে; কিন্তু ইহাতে তথ্যের নির্ভুলতা ও সময়োপযোগিতা লইয়া প্রশ্ন উঠিতেছে। ডপলার রাডার অচল থাকিলে সমুদ্র হইতে আসা ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপের গতিপথ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। সাধারণত একটি রাডার ৩০০ হইতে ৪০০ কিলোমিটার দূরের আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিতে পারে যাহা উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ১২ হইতে ২৪ ঘণ্টা আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম। এই ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় আমাদের উপকূলবাসী ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছেন। তাহা ছাড়া আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্র হইতে মেঘের বিস্তার বোঝা গেলেও বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও স্থানীয় প্রভাব সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না। এই জন্য রাডার-নির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাই সবচাইতে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসাবে বিবেচিত।

উপর্যুক্ত করুণ পরিস্থিতির মূলে রহিয়াছে প্রধানত তিনটি কারণ। প্রথমত, আমাদের যন্ত্রাংশের মেয়াদোত্তীর্ণতা ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়াছে। অধিকাংশ রাডারের কার্যকারিতার মেয়াদ বহু পূর্বেই শেষ হইয়া গিয়াছে। দ্বিতীয়ত, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বিদ্যমান। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রযুক্তি ক্রয় করা হইলেও, নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করা হইয়াছে। ইহারই কুফল এখন আমরা ভোগ করিতেছি। তৃতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও যথাসময়ে অর্থায়নের অভাবও রহিয়াছে। বিকল যন্ত্রাংশ মেরামত বা নতুন প্রযুক্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করিয়াছে। যেই দেশে প্রতি বৎসর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, যেইখানে বজ্রপাতে প্রতি বৎসর শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে, সেই দেশে রাডার-ব্যবস্থার এই রূপ করুণ দশা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নহে, বরং জননিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলিবার শামিল। নিখুঁত পূর্বাভাসের অভাবে উপকূলবর্তী লক্ষ লক্ষ মৎস্যজীবী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ আজ প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িয়াছে।

এই জাতীয় বিপর্যয় হইতে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সরকারকে অবিলম্বে দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একপাশে সরাইয়া অতি দ্রুত বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল ও আধুনিক যন্ত্রাংশ আমদানি করিয়া অচল রাডারগুলি সচল করিতে হইবে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিকল্প কোনো প্রযুক্তির সাহায্যে উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করিয়া তথ্য সংগ্রহের গতি বাড়াইতে হইবে। যেই সকল রাডারের মেয়াদ সম্পূর্ণ শেষ হইয়া গিয়াছে, সেইগুলির পরিবর্তে অত্যাধুনিক ‘এস-ব্যান্ড’ বা ‘সি-ব্যান্ড' ডপলার রাডার ক্রয়ের জন্য জরুরি তহবিল বরাদ্দ করা আবশ্যক। আর কেবল যন্ত্র কিনিলেই চলিবে না, তাহা পরিচালনার জন্য দেশীয় প্রকৌশলী ও আবহাওয়াবিদদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিতে হইবে এবং বার্ষিক বাজেটে আবহাওয়া খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করিতে হইবে। আমরা মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রান্তিকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরকে পঙ্গু করিয়া রাখিবার কোনো অবকাশ নাই। মনে রাখিতে হইবে, নিখুঁত পূর্বাভাস কেবল কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য নহে, ইহা দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের রক্ষাকবচ। অতএব, সরকার অবিলম্বে এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন বলিয়া আমরা আশা করি।

ইত্তেফাক/এনএন