যোগ্যতায় আকাল পড়িল!

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৫

একটি রাষ্ট্রের মূল শক্তি তাহার প্রাকৃতিক সম্পদে নহে, মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদই যদি ধীরে ধীরে যোগ্যতার সংকটে নিমজ্জিত হইয়া পড়ে, তাহা হইলে সেই জাতির উন্নয়নের সকল উচ্চাকাঙ্ক্ষাই হইয়া পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফল যেন সেই কঠিন বাস্তবতারই এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি প্রকাশ ঘটাইল। এই বিসিএসে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ার কারণে প্রায় ২ হাজার ক্যাডার পদ শূন্য রাখিতে হইয়াছে, যাহার বড় অংশই আবার বিশেষায়িত ক্যাডারের পদ। এই ঘটনা নিছক একটি নিয়োগ-প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা বা পরীক্ষার ফলাফল নহে; বরং ইহা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠনের সামগ্রিক চিত্র এবং জ্ঞানচর্চার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে গভীর আত্মসমালোচনার অবকাশ সৃষ্টি করিয়াছে। ইহার সহিত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণ করিবার মতো পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করিতে আমরা ব্যর্থ হইতেছি কি না, সেই প্রশ্নও অমূলক নহে।

বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগ অতিক্রম করিতেছে, যেইখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, জৈবপ্রযুক্তি কিংবা সাইবার নিরাপত্তার ন্যায় ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করিয়া নির্মিত হইতেছে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি। এই প্রতিযোগিতায় যেই সকল দেশ জ্ঞান ও গবেষণায় অগ্রসর, নেতৃত্বের আসনে রহিয়াছে কেবল তাহারাই। ঐ সকল দেশে বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত জ্ঞানের হাতেখড়ি হয়, যাহার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাইবার পূর্বেই তাহাদের চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ভিত দৃঢ় হইয়া যায়। অথচ আমাদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।

বাংলাদেশ আজ জনমিতিক সুবিধার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অবস্থান করিতেছে। বিশেষজ্ঞ মহল বহু দিন ধরিয়াই সতর্ক করিয়া আসিতেছেন যে, এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আমাদের সর্ববৃহৎ সম্পদ হইতে পারে, আবার দক্ষতার অভাবে ইহারাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য বোঝায় পরিণত হইতে পারে। তবে দুঃখজনক হইল, দেশে প্রতি বছর অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় হইতে হাজার হাজার স্নাতক বাহির হইতেছেন; কিন্তু শিল্প, গবেষণা কিংবা রাষ্ট্রের বিশেষায়িত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির সংকট যেন কাটিতেছেই না। সংখ্যার দিক দিয়া শিক্ষিত মানুষের বৃদ্ধি ঘটিলেও গুণগত উৎকর্ষে আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌছাইতে পারি নাই। ব্যাঙের ছাতার ন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিয়াছে বটে; কিন্তু সর্বত্র শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় নাই। কোথাও গবেষণাগার নাই, কোথাও দক্ষ শিক্ষক নাই, কোথাও আবার শিক্ষাকে নিছক বাণিজ্যে পরিণত করা হইয়াছে। যেই প্রতিষ্ঠান নিজেই উৎকর্ষের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হইতে পারে না, তাহার পক্ষে যোগ্য, দক্ষ, উৎকৃষ্ট মানবসম্পদ গঠন কতখানি সম্ভব, তাহা ভাবিয়া দেখা আবশ্যক। ইহা কেবল শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা নহে; বরং শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণেরও সম্মিলিত দায়। অবশ্য সকল দায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর চাপাইয়া দায়মুক্তির সুযোগও নাই। প্রযুক্তির এই যুগে জ্ঞানের ভান্ডার আজ বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠায়। আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম, গবেষণাপত্র, অনলাইন কোর্স কিংবা প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ-সকল কিছুই এখন সহজলভ্য। অর্থাৎ, আত্মোন্নয়নের দায় শিক্ষার্থীরও কম নহে!

এই যখন অবস্থা, তখন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরিয়া রাখা এবং জ্ঞানের চর্চাকে বিকশিত করিবার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, অনুপ্রেরণা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কি অপরিহার্য নহে? গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতা, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম ছাড়া এই সংকট কি কাটানো সম্ভব? উক্ত বিসিএসের শূন্যপদের ঘটনাই শুধু নহে, অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও অনুরূপ চিত্র দেখা যায় এবং ইহা যেন নিয়মিত চিত্র হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রবণতা কি আমাদের উদ্দেশে এই সতর্কসংকেত ছুড়িয়া দেয় না যে, আজ যদি আমরা বিশেষায়িত পদে যোগ্য জনশক্তির সংকট কাটাইয়া উঠিতে না পারি, তাহা হইলে আগামী দিনে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণ-সর্বত্রই ইহার নেতিবাচক অভিঘাত পড়িবে? সুতরাং, আমাদের ভাবিয়া দেখিতে হইবে-আমরা কি কেবল সনদধারীর সংখ্যা বাড়াইব, নাকি যোগ্য মানবসম্পদ গড়িয়া তুলিব? যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের আকাল-একটি জাতির জন্য ইহার চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হইতে পারে?

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন