বুড়িগঙ্গার মুক্তি ও ধলেশ্বরীর কান্না!

রাজধানী ঢাকাকে বুড়িগঙ্গার প্রাণঘাতী দূষণ হইতে রক্ষা করিবার নিমিত্ত হাজারীবাগ হইতে চামড়াশিল্প বা ট্যানারি সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময় ধারণা করা হইয়াছিল, এই দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুজ্জীবিত হইবে এবং আধুনিক বর্জ্য শোধনব্যবস্থার মাধ্যমে চামড়াশিল্পও একটি পরিবেশবান্ধব শিল্পে রূপ লাভ করিবে; কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন আমাদের এক রূঢ় ও মর্মন্তুদ বাস্তবতার সম্মুখীন করিয়াছে। বুড়িগঙ্গার দূষণ আংশিক হ্রাস পাইলেও, সাভারের ধলেশ্বরী নদী এখন ট্যানারির অপরিশোধিত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হইয়া বর্তমানে মৃতপ্রায়। ধলেশ্বরীর জল ইতিমধ্যে ধারণ করিয়াছে কৃষ্ণবর্ণ, জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলুপ্তপ্রায় এবং এইখানকার সমগ্র বায়ুমণ্ডল তীব্র দুর্গন্ধে ভারী হইয়া উঠিয়াছে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাইতে গিয়া ধলেশ্বরীকে বলি দেওয়ার এই আত্মঘাতী নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে।

আইএমইডির সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ১৮ বৎসর ছয় মাস ধরিয়া কচ্ছপগতিতে চলা এই প্রকল্পের ব্যয় ১৭৫ কোটি টাকা হইতে বর্ধিত হইয়া ১০১৫ কোটি টাকায় উপনীত হইয়াছে। অথচ, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) আজ অকার্যকর বলিলেই চলে। নকশাগত ত্রুটি, ধারণক্ষমতার অধিক বর্জ্যের প্রবাহ, অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার, বিদ্যুৎসংকট, দক্ষ জনবলের অভাব এবং বাইপাস ড্রেনের মাধ্যমে সংগোপনে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে অবমুক্তকরণ প্রকল্পটির ব্যর্থতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করিয়াছে। যেই সিইটিপি এই প্রকল্পের প্রাণভ্রমরা হইবার কথা ছিল, তাহা আজ এক অকেজো শ্বেতহস্তীতে পরিণত হইয়াছে। তদুপরি, স্লাজ ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ক্রোম ব্লকের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করিয়া রাখিয়াছে। পরিবেশ রক্ষা না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জনে ব্যর্থ হইয়া ৬৫ শতাংশ বিদেশি ক্রেতা হারাইয়াছে এই শিল্প। ইহা কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি সাধন করে নাই, উপরন্তু দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকেও দুর্বল করিয়া দিয়াছে। চামড়াশিল্পের আজ যে অবনতি লক্ষ করা যাইতেছে এবং প্রতি বৎসর কোরবানি ঈদের পর চামড়া সংগ্রহ ও মূল্য লইয়া যে হা-হুতাশ তৈরি হয়, ইহার পিছনে এই সকল কারণও পালন করিতেছে অনুঘটকের ভূমিকা।

এখন প্রশ্ন হইল, নদী রক্ষা করিয়াও কীভাবে চামড়াশিল্প রক্ষা ও বিকশিত করা যায়? বিকল্প উপায়ে এই সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের উন্নতি সাধন করা মোটেও অসম্ভব নহে। সরকারের এখন এই ব্যাপারে গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে। পরিবেশ এবং শিল্পকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানাইয়া টিকসই উন্নয়নের বিকল্প ভাবিতে হইবে। প্রথমত, বর্তমান সিইটিপির নকশাগত ত্রুটিসমূহ দূর করিয়া ইহাকে শতভাগ কার্যকর ও আধুনিকায়ন করা আবশ্যক। কারখানাসমূহে পানির অপচয় হ্রাস করিয়া ‘থ্রিআর’ (রেনোভেশন, রিসাইকেল, রিইউজ) পদ্ধতির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করিতে হইবে, যাহাতে নদীতে বর্জ্য ফেলিবার পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়া আসে। দ্বিতীয়ত, কঠিন বর্জ্য ও ক্রোমিয়াম পৃথকীকরণের জন্য প্রতিটি ট্যানারিতে নিজস্ব ‘প্রি-ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হউক। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারী ট্যানারির লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর দণ্ডের বিধান করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, পরিবেশবান্ধব গ্রিন ট্যানারি বা ‘সবুজ শিল্পনগরী’র ধারণা প্রবর্তন করিতে হইবে-যেইখানে ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ বা এনজাইম-ভিত্তিক বিকল্প উপাদান ব্যবহারে ট্যানারি মালিকদের দিতে হইবে বিশেষ প্রণোদনা। চতুর্থত, স্লাজ বা কঠিন বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিমেন্ট উৎপাদন কিংবা জৈবসারে রূপান্তরের বাইপ্রোডাক্ট উদ্যোগ লইতে হইবে। সর্বোপরি, একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং সেল গঠনপূর্বক ধলেশ্বরীর পানি নিয়মিত পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে ট্যানারিসমূহকে বাধ্য করিতে হইবে। মোট কথা, আমরা নদী মারিয়া শিল্পকারখানা চাহি না। ইহা দেশের প্রকৃত উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। বরং নদীর জীবন রক্ষা করিয়াই চামড়াশিল্পের টিকসই বিকাশ সুনিশ্চিত করিতে আমাদের সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।