লেয়ার (ডিম উৎপাদনকারী) মুরগির খামারিরা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রায় ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে রয়েছেন। চলতি বছর (২০২৬) প্রথম সাত মাসের মধ্যে কেবল মে মাসেই তারা ডিম বিক্রি করে কিছুটা মুনাফা করতে পেরেছেন। ভোক্তা চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাকি ছয় মাস খামারিদের উৎপাদন খরচের নিচে দামে ডিম বিক্রি করতে হয়েছে।
ডিমের দাম যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল, তখন অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন যে কোনো কার্টেল বা ‘সিন্ডিকেট’ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে খামারি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি সেই অভিযোগকে ভুল প্রমাণ করেছে। তাদের মতে, যদি কোনো সিন্ডিকেট সত্যিই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে ডিমের দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যেত না। প্রতিদিন হাজার হাজার খামারি ও ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণে পরিচালিত এ বাজারে এককভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় গত কয়েক মাস ধরে বাজারদর নিম্নমুখী ছিল। তবে সম্প্রতি কিছুটা দাম বাড়তে শুরু করেছে। তাদের ধারণা, বন্যাকবলিত এলাকায় পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সাময়িকভাবে সরবরাহ কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
খাতসংশ্লিষ্টদের অনুমান অনুযায়ী, দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) ডিম উৎপাদিত হয়, যা মাথাপিছু বছরে প্রায় ১০০টি ডিমের সমান। এছাড়া গ্রামীণ পরিবারে পালন করা মুরগি ও হাঁস থেকে প্রতিদিন আরও প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ডিম উৎপাদিত হয় বলে ধারণা করা হয়। সব মিলিয়ে দেশে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা প্রায় ১২০টি। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারদর নিম্নমুখী থাকায় সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমান উৎপাদন দেশের চাহিদার তুলনায় বেশি।
১০ জুলাই মানিকগঞ্জের কয়েকজন ডিম উৎপাদনকারী জানান, ২০২৪ সালে ডিমের উচ্চমূল্য অনেক খামারিকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎসাহিত করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
খামারিদের মতে, সাধারণত গ্রীষ্মকালে তারা ডিমের ভালো দাম পাওয়ার আশা করেন। কিন্তু এবার গ্রীষ্মেও বাজারদর কম থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—শাকসবজির কম দাম (যা অনেক ক্ষেত্রে ডিমের বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়), শিল্পাঞ্চলে ডিমের চাহিদা হ্রাস এবং উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার ফলশাটি গ্রামের খামারি মজিবুর রহমান (৫১) প্রায় ৫,৪০০ লেয়ার মুরগি পালন করেন। তিনি বলেন,
“শীতকালে ডিমের দাম কিছুটা কমে যাওয়াকে আমরা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। কারণ, তখন শাকসবজি এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে উৎপাদিত ডিমের সরবরাহ বেড়ে যায়। কিন্তু শীত মৌসুম শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ডিমের দাম কম থাকায় আমরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছি।”
তিনি জানান, গত ৯ জুলাই তিনি প্রতি ডিম ৮.৭৫ টাকা দরে বিক্রি করেছেন, অথচ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১০ টাকা। বর্তমানে খামার পর্যায়ে ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য ৮.৫০ থেকে ৯.০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা এই খামারি জানান, আগের উৎপাদন চক্রে প্রায় ১৩ লাখ টাকা মুনাফা হলেও বর্তমান ব্যাচে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০১০ সাল থেকে লেয়ার খামার পরিচালনাকারী মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দতোরা গ্রামের ফয়জুর রহমান (৪৮) বলেন, গত দুই বছরে নতুন খামারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। তার ভাষায়,
প্রতিটি ডিম ১০ টাকার নিচে বিক্রি হলে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন।
একই উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামের খামারি হাবিবুর রহমান (৩৮) জানান, তিনি ৪,০০০ মুরগির খামার থেকে উৎপাদিত প্রতিটি সাদা ডিম মাত্র ৭ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তার মতে, স্থানীয় পোশাক কারখানাগুলোতে আগের তুলনায় ডিমের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি সরকারের কাছে এমন একটি উন্মুক্ত বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে খামারিরা সরাসরি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছে দর-কষাকষির মাধ্যমে ডিম বিক্রি করতে পারবেন।
শিবালয়ের তেপ্রা বাজারের ডিম ব্যবসায়ী আব্দুল কাইয়ুম (৪১), যিনি প্রতিদিন প্রায় ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ ডিম বিক্রি করেন, বলেন বাজারে দামের ওঠানামার কারণে খামারিরা লাভ-লোকসানের মুখোমুখি হলেও হাজারো ক্রেতা ও বিক্রেতার অংশগ্রহণের কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তার হিসাব অনুযায়ী, খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় বাদামি ডিমের ন্যূনতম দাম ১০ টাকা এবং সাদা ডিমের দাম ৯ টাকার ওপরে থাকা প্রয়োজন।
দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে ডিমের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সাভারের ব্যবসায়ী রবিউল আউয়াল (৪৯) বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ডিম কেনাবেচা করেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে ডিমের উৎপাদন অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু সেই হারে চাহিদা বাড়েনি।
তিনি আরও জানান, অতীতে অনেক পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের টিফিনে ডিম ও কলা দেওয়া হলেও বর্তমানে অতিরিক্ত সময় কাজ কমে যাওয়ায় সেই চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তার মন্তব্য,গত কয়েক বছরে ডিমের দামে অনেক ওঠানামা হয়েছে, কিন্তু আমি কখনোই কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব দেখিনি।
ডিম ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হলো, দেশের অধিকাংশ পাইকারি ব্যবসায়ী ও খামারি তেজগাঁওয়ের পাইকারি বাজারের দরের ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখেন। বাজারে চাহিদা উৎপাদনের তুলনায় বেশি হলে তেজগাঁওয়ে ডিমের দাম বেড়ে যায়, ফলে খামারিরাও বেশি দাম দাবি করেন। আবার উৎপাদন চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেলে তেজগাঁওয়ের দর কমে যায় এবং ব্যবসায়ীরা খামারিদের কাছ থেকে কম দামে ডিম কেনার প্রস্তাব দেন। প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় মূল্য নির্ধারণের এ প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
‘এগ ট্রেডার্স মাল্টিপারপাস সমিতি’র অন্যতম নেতা আমানত উল্লাহ জানান, তেজগাঁও পাইকারি বাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ডিম কেনাবেচা হয়। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অনেক পাইকারি বাজার থাকায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে এককভাবে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তার মতে, বাজারদর মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যের ওপরই নির্ভরশীল।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিমসহ অধিকাংশ কৃষিপণ্যের বাজার একটি চক্রাকার ধারা অনুসরণ করে, যা অর্থনীতিতে ‘কবওয়েব চক্র’ (Cobweb Cycle) নামে পরিচিত।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো এক বছরে বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দিলে দাম বেড়ে যায়। উচ্চমূল্যের প্রভাবে উৎপাদকরা পরবর্তী বছরে উৎপাদন বাড়ান। এর ফলে অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি হয় এবং দাম কমে যায়। দীর্ঘ সময় দাম কম থাকলে উৎপাদকরা আবার উৎপাদন কমিয়ে দেন। তখন বাজারে সরবরাহ হ্রাস পেয়ে দাম আবার বাড়তে শুরু করে। এভাবেই উৎপাদন ও দামের মধ্যে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র সৃষ্টি হয়, যা কৃষিপণ্যের বাজারে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।