দুর্লভ এক রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে মেসি

ফুটবলের এক অনন্য প্রতিভা লিওনেল মেসি। ফুটবল জীবনে তার আর অপূর্ণতার গল্প নেই। তবে বিশ্বকাপের সঙ্গে লিওনেল মেসির সম্পর্ক দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বেদনা, লড়াই আর শেষ পর্যন্ত পূর্ণতার গল্প। ২০০৬ সালে কিশোর প্রতিভা হিসেবে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করা মেসি একের পর এক বিশ্বকাপ খেলেছেন, দেখেছেন কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়, ২০১৪ সালের ফাইনালের হৃদয়ভাঙা হার এবং ২০১৮ সালের চরম হতাশা।

কিন্তু তিনি কখনোই থামেননি। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে পূরণ করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা। সেই আসরে জেতেন গোল্ডেন বলও, যা তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র দুই বারের গোল্ডেন বলজয়ী ফুটবলার বানায়।

বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা, অসংখ্য গোল ও অ্যাসিস্ট, রেকর্ডসংখ্যক ম্যান অব দ্য ম্যাচ সংখ্যাগুলো যেমন মেসির শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী, তেমনি তার নেতৃত্ব, ধৈর্য ও জয়ের ক্ষুধাই তাকে আলাদা করে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন। কিন্তু স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের যে গল্প লিওনেল মেসি লিখেছেন, তা ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। সেই মেসির সামনে নতুন আরেক রেকর্ডের হাতছানি।

আজ আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলেই কোনো অধিনায়কের পরপর দুই বিশ্বকাপ জেতার অনন্য রেকর্ড যাবে তার দখলে।

আসলে ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু সেরা দলের লড়াই নয়, এটি নেতৃত্বেরও সর্বোচ্চ পরীক্ষা। চার বছর পরপর আয়োজিত এই মঞ্চে একজন অধিনায়কের কাঁধে থাকে কোটি মানুষের স্বপ্ন, ড্রেসিংরুমের ভারসাম্য, মাঠের সিদ্ধান্ত এবং চাপ সামলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব। তাই বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তোলা একজন অধিনায়কের নামই ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা পায়।

১৯৩০ সালে উরুগুয়ের হোসে নাসাসি থেকে শুরু করে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি প্রতিটি বিশ্বকাপেরই একজন বিজয়ী অধিনায়ক আছে। ববি মুর ইংল্যান্ডকে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন, ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ার পশ্চিম জার্মানিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দিয়েগো ম্যারাদোনা ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে শিখরে তুলেছেন, দিদিয়ে দেশঁম ফ্রান্সকে, কাফু ব্রাজিলকে, ইকের কাসিয়াস স্পেনকে, ফিলিপ লাম জার্মানিকে এবং হুগো লরিস ফ্রান্সকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছেন।

কিন্তু এই দীর্ঘ ইতিহাসে একটি জায়গা এখনো একেবারেই শূন্য। কোনো অধিনায়কই দ্বিতীয় বার বিশ্বকাপের ট্রফি তুলতে পারেননি। কেউ হয় অবসর নিয়েছেন, কেউ পরের আসরে ব্যর্থ হয়েছেন, আবার কেউ ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেও শিরোপা ধরে রাখতে পারেননি।

যদি আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপ জিতে এবং লিওনেল মেসি অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, তবে সেই শূন্যস্থান চিরতরে পূরণ হবে। তিনি হবেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক, যিনি দুই বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এটি শুধু আরেকটি শিরোপা হবে না; এটি হবে নেতৃত্বের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। মারাদোনার উত্তরসূরি হিসেবে যাত্রা শুরু করা মেসি তখন নিজের জন্য এমন এক আসন তৈরি করবেন, যেখানে এর আগে কেউ পৌঁছাতে পারেননি। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে বিশ্বকাপ জিতলেও একই অধিনায়ক ছিলেন না। আবার ১৮৫৮ ও ১৮৬২ সালে ব্রাজিল পরপর দুবার  চ্যাম্পিয়ন হলেও প্রথম বার (৫৮) নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক বেলিনি। পরের বার (৬২) নেতৃত্ব দেন মাওরো রামোস। ফলে মেসির সামনে এক ইতিহাস কেবলই ডাক দিচ্ছে।

ফুটবল ইতিহাসে রেকর্ড ভাঙে, নতুন নায়ক আসে। কিন্তু কিছু রেকর্ড সময়ের পরীক্ষায় এতটাই দুর্লভ হয়ে ওঠে যে সেগুলো অর্জন করাই কিংবদন্তি হওয়ার সংজ্ঞা। দুই বার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক এমন একটি পরিচয় কিন্তু আজও কারো নয়। আর্জেন্টিনা জিতলে, সেই পরিচয়টি হবে শুধুই লিওনেল মেসির। হয়তো আজ মেসি সে লক্ষ্য নিয়েও নামবেন। দেশের সাবেক তারকা ফুটবলার ইমতিয়াজ সুলতান জনি বলেন, আজ মেসি এই অনন্য  রেকর্ড গড়তে পারেন। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলেই তিনি হবেন সেই গর্বিত অধিনায়ক। যা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেননি সেটাই তিনি পূর্ণ করবেন। আর সেই রেকর্ড কোন জনমে কে ভাঙতে পারবে তা থাকবে অজানা।