পেটের মেদকে অনেকেই শুধু সৌন্দর্যহানি বা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির কারণ হিসেবে মনে করেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, পেটের অতিরিক্ত চর্বি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেটের গভীরে লিভার, অগ্ন্যাশয় ও অন্ত্রের চারপাশে জমে থাকা ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং বিপাকজনিত নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। এর প্রভাবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগে ঘাটতি, জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাস এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
ইমিউন নেটওয়ার্ক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্ত্র শুধু খাবার হজমের কাজই করে না বরং এটি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্ত্রে থাকা উপকারী অণুজীব বা গাট মাইক্রোবায়োম মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের ভাষ্য, শরীরের সব ধরনের চর্বি সমান ক্ষতিকর নয়। ত্বকের নিচে থাকা সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাটের তুলনায় ভিসেরাল ফ্যাট অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এটি এমন কিছু প্রদাহজনিত রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা রক্তনালি, ইনসুলিনের কার্যকারিতা এবং মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করতে পারে। এতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং স্নায়ুকোষগুলোর স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়।
এর ফলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়া, মনোযোগের ঘাটতি, চিন্তাশক্তি ধীর হয়ে যাওয়া, নতুন বিষয় শেখায় অসুবিধা এবং জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে যাদের কোমরের মাপ বেশি থাকে, তাদের পরবর্তী জীবনে আলঝেইমারসসহ বিভিন্ন ধরনের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক বেশি।
শুধু শারীরিক নয়, অতিরিক্ত পেটের মেদ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি ও শক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যার সঙ্গেও ভিসেরাল ফ্যাটের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চর্বি থেকে নির্গত প্রদাহজনিত উপাদান মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং বয়স বৃদ্ধির কারণে ভিসেরাল ফ্যাট জমার ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি স্বাভাবিক ওজনের মানুষের শরীরেও পেটের ভেতরে ক্ষতিকর চর্বি জমতে পারে। তাই শুধু ওজন নয়, কোমরের পরিধিও সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের পরামর্শ, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ভিসেরাল ফ্যাট কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে শুধু হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিই কমবে না, দীর্ঘদিন মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তিও ভালো রাখা সম্ভব হবে।
সূত্র: এনডিটিভি