পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ ডানহাত ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। লেখা থেকে খাওয়া—সব কাজে একই হাতের প্রাধান্য। কিন্তু কেন? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানব মস্তিষ্কের গঠন, বিবর্তনের ইতিহাস এবং ভাষার বিকাশের গভীরে।
যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ নাটালি উয়োমিনির মতে, ইতিহাসে এমন কোনো মানব জনগোষ্ঠীর খোঁজ পাওয়া যায়নি, যেখানে বামহাতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। হাতের এই পক্ষপাত আসলে শুরু হয় মস্তিষ্ক থেকে। মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ শরীরের ডান দিক নিয়ন্ত্রণ করে, আর ডান গোলার্ধ নিয়ন্ত্রণ করে বাম দিক। এই স্নায়বিক ক্রসওভারের কারণেই ডান হাতের নিয়ন্ত্রণ থাকে মস্তিষ্কের বাম দিকে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, মস্তিষ্কের এই দুই ভাগে শ্রম বিভাজনের ইতিহাস ৫০ কোটি বছরেরও পুরোনো। বাম গোলার্ধ অভ্যাসগত কাজ যেমন খাদ্যসংগ্রহের মতো নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে, আর ডান গোলার্ধ পরিবেশের যেকোনো আকস্মিক হুমকি মোকাবিলায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মাছ, ব্যাঙ ও পাখির ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা দেখা যায়; এরা ডান চোখে দেখা শিকারের দিকেই বেশি আক্রমণ করে।
জ্ঞানবিজ্ঞানী স্টেফানি ব্র্যাকিনি ও তার সহকর্মীরা 'জার্নাল অব হিউম্যান ইভোলিউশন'-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলেছেন, প্রাথমিক মানব পূর্বপুরুষরা যখন চার পায়ে হাঁটা ছেড়ে দুই পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখেন, তখন হাত দুটি মুক্ত হয় নতুন কাজে ব্যবহারের জন্য। সেই সময় থেকেই একটি হাতকে বেশি ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হতে থাকে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, শিম্পাঞ্জিরা চার পায়ে থাকলে কোনো হাতের বিশেষ পক্ষপাত দেখায় না, কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়ালেই একটি নির্দিষ্ট হাতের প্রতি পক্ষপাত তৈরি হয়। তবে শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে ডান বা বামহাতির সংখ্যা প্রায় সমান।
প্রাচীন পাথরের হাতিয়ার থেকেও বিবর্তনের এই ইতিহাসের সূত্র পাওয়া যায়। গবেষকরা নিজেরাই প্রাচীন পাথরের হাতিয়ার তৈরি করে ডান ও বামহাতিদের কাজের নমুনা সংগ্রহ করে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ারের সঙ্গে মেলান। এতে দেখা গেছে, দুই কোটি বছরের বেশি পুরোনো হাতিয়ারে ডানহাতির সুস্পষ্ট প্রাধান্যের প্রমাণ সীমিত। তবে কেনিয়ার কুবি ফোরায় ১৫ লাখ বছর আগে হোমো হ্যাবিলিস ও হোমো ইরেক্টাসের তৈরি হাতিয়ারে প্রজাতিব্যাপী ডানহাতির কিছু প্রমাণ মিলেছে। আর প্রায় ৬ লাখ বছর আগে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস প্রজাতির আমলে ডানহাতির প্রাধান্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রজাতির দাঁতে থাকা ক্ষয়ের ধরন থেকে বোঝা যায়, তারা ডান হাত দিয়েই মুখে খাবার তুলত।
কিন্তু এই পরিবর্তন ঠিক কেন ঘটল? এর একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হলো 'হোমো লোকোয়েন্স' (ভাষাবান মানব) অনুকল্প। এই তত্ত্ব বলে, সোজা হয়ে হাঁটতে শেখার ফলে মস্তিষ্কের পক্ষপাত তৈরি হয়, আর পরবর্তীতে ভাষার বিকাশ ডানহাতির প্রাধান্যকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ, ডানহাতির মতো ভাষাপ্রক্রিয়াও মূলত মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে পরিচালিত হয়। আসলে বাম গোলার্ধে ভাষাপ্রক্রিয়ার এই কেন্দ্রীভবন ডানহাতির প্রবণতার চেয়েও বেশি সার্বজনীন। তাই মনে করা হয়, ভাষার বিকাশের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই ডানহাতির প্রাধান্য আরও বেড়েছে।
তবে এই অনুকল্প প্রমাণ করা কঠিন। কারণ এর জন্য মৃত পূর্বপুরুষদের স্নায়বিক পরীক্ষা করা দরকার, যা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ডানহাতির এই বিশ্বজয়ের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে, বামহাতিরা কি নিজেদের বঞ্চিত মনে করতে পারেন? ১৯৭৭ সালে 'সাইকোলজিক্যাল বুলেটিন' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, বামহাতি হলেই কোনো ঘাটতি তৈরি হয়—এমন প্রমাণ নেই। বরং কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কে আঘাত পেলে বামহাতিরা কিছুটা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। এছাড়া লড়াইয়ে বামহাতের অতর্কিত আক্রমণের সুবিধার কারণে কুস্তি বা বক্সিংয়ের মতো লড়াইভিত্তিক খেলাধুলায় বামহাতিরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
হাতের পক্ষপাত নিয়ে গবেষণা কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যেও হাত বা পায়ের পক্ষপাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই পক্ষপাত যেভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে (ডান) এত বেশি মাত্রায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তা বিবর্তনের ইতিহাসে এক বিরল ও চমকপ্রদ ঘটনা। ভাষা, সরঞ্জাম তৈরি এবং সোজা হয়ে হাঁটার মতো মানব-বিবর্তনের তিনটি মূল মাইলফলক একসঙ্গে কাজ করেই হয়তো এই ব্যতিক্রমী প্রবণতা তৈরি করেছে।