কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজের স্বীকৃতি সাধারণত আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কথা। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে সেই প্রশংসাই নতুন মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কর্মজীবনে অনেকেই ব্যর্থতার চেয়ে বেশি ভোগেন অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার আশঙ্কায়। বস, সহকর্মী কিংবা প্রিয়জনের আস্থা হারানোর ভয় ধীরে ধীরে উদ্বেগ ও মানসিক ক্লান্তির জন্ম দেয়।
ভারতের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের উদ্বেগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একটি কাজ শেষ হওয়ার পরও বারবার তা যাচাই করেন, সামান্য ভুল নিয়েও দীর্ঘ সময় দুশ্চিন্তায় থাকেন এবং কাজের সময় শেষ হলেও মানসিকভাবে কর্মস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসা অনুপ্রেরণার বদলে আরও বেশি প্রত্যাশার চাপ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার দক্ষ বা সেরা কর্মী হিসেবে পরিচিতি তৈরি হলে সেই মান ধরে রাখার অদৃশ্য চাপ কাজ করতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিক ভুলও বড় ব্যর্থতা বলে মনে হয় এবং আত্মবিশ্বাসের জায়গা দখল করে নেয় উদ্বেগ।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষ্য, এই প্রবণতার শিকড় অনেক সময় শৈশবের পারিবারিক পরিবেশে নিহিত থাকে। যেসব পরিবারে সন্তানের মূল্যায়ন মূলত ফলাফল, সাফল্য বা দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে হয়, সেখানে বড় হওয়ার পর আত্মমর্যাদা অনেকাংশে অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন বস, সহকর্মী বা পরিবারের সদস্যদের প্রশংসাই আত্মবিশ্বাসের প্রধান উৎসে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, অন্যকে হতাশ করার ভয় সাধারণ ব্যর্থতার ভয় বা ‘ইমপোস্টার সিনড্রোম’-এর থেকে আলাদা। ব্যর্থতার ভয় নিজের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ইমপোস্টার সিনড্রোমে নিজের সাফল্যকে প্রাপ্য মনে না হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু অন্যকে হতাশ করার ভয় মূলত সম্পর্ককেন্দ্রিক, যেখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে অন্যের বিশ্বাস বা আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা।
এ ধরনের মানসিকতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অতিরিক্ত কাজের চাপ নেওয়া, বিশ্রামে অপরাধবোধ, ছুটি নিতে অনীহা, সব সময় নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত মানসিক অবসাদ বা বার্নআউটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, আত্মমর্যাদা যেন কেবল অন্যের প্রশংসার ওপর নির্ভরশীল না হয়। নিজের মূল্যবোধ, আন্তরিক প্রচেষ্টা ও বাস্তবসম্মত লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিখুঁত হওয়ার চেয়ে যথেষ্ট ভালোভাবে কাজ করাও যে সফলতার অংশ, সেই মানসিকতা গড়ে তোলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া ও ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ করা মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস