কোটি টাকার সেতু পার হতে লাগে বাঁশের সাঁকো

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঘড়িসার ইউনিয়নের হুগলী নদীর ওপর ৯০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ শেষ হয়েছে দুই বছর আগে। কিন্তু সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ না করায় এখনো সেতুটি পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো বেয়ে সেতুতে উঠতে হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষের নড়িয়া উপজেলা সদরে যাতায়াত সহজ করতে থিরপাড়া এলাকায় হুগলী নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের নভেম্বরে নিয়াজ-আরকে নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯০ মিটার সেতু এবং দুই পাশে মোট ২৮৫ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের পর ২০২৪ সালের জুনে সেতুর নির্মাণ শেষ হয়। পরে পূর্ব পাশের ১৮০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মিত হলেও পশ্চিম পাশের ১০৫ মিটার সংযোগ সড়ক এখনো করা যায়নি।

এলজিইডির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালে সেতু নির্মাণের জন্য সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের সময় দুই প্রান্তে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় দুই একর জমি থাকার বিষয়টি জানা যায়। তবে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে সেতুর নির্মাণ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের (তৎকালীন আওয়ামী লীগের) সহায়তায় পূর্ব পাশের সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে ওই অংশের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়।

কিন্তু পশ্চিম পাশের জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি ছাড়তে রাজি হননি। তাদের দাবি, জমির পাশাপাশি সেখানে থাকা স্থাপনারও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ব্যয় না থাকায় ঠিকাদার ওই অংশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে পারেননি। এ অবস্থায় গত বছরের নভেম্বরে এলজিইডির নড়িয়া উপজেলা প্রকৌশলী ৮১ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে পাঠান। তবে প্রকল্পে এ খাতে বরাদ্দ না থাকায় বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।

সেতু নির্মাণের পর থিরপাড়া ঘাটে নৌকায় পারাপারও বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই বাঁশের একটি সাঁকো তৈরি করেন। সেই সাঁকো ব্যবহার করেই প্রতিদিন মানুষ সেতুতে ওঠানামা করছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভেদরগঞ্জের চরভাগা ও নড়িয়ার ঘড়িসার ইউনিয়নের বাসিন্দারা ঘড়িসার বাজার, কার্তিকপুর, গোলার বাজার ও উপজেলা সদরে যেতে বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করছেন। দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একই পথে চলাচল করছে। অসুস্থ রোগীদেরও একইভাবে সেতু পার হতে হচ্ছে।

চরভাগা এলাকার বাসিন্দা সাগর সরদার বলেন, প্রতিদিন অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ এই পথে চলাচল করেন। আগে নৌকায় পারাপার হতো, এখন সেতু হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করতে হচ্ছে। গত এক বছরে সাঁকো থেকে পড়ে কয়েকজন নারী ও শিশু আহত হয়েছেন।

থিরপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী শাহ আলম মাল বলেন, ১৫ বছর ধরে তিনি ঘাট এলাকায় মুদি দোকান চালান। সংযোগ সড়ক নির্মাণ হলে তার দোকানটি ভেঙে ফেলতে হবে। ক্ষতিপূরণ ছাড়া দোকান ছাড়লে জীবিকা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে জমি ছেড়ে দেয়া হবে।

এলজিইডির নড়িয়া উপজেলা প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এক প্রান্তের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা যাচ্ছে না। জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি ছাড়তে রাজি নন। এ কারণে সেতুটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, সেতু নির্মাণের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জমির মালিকেরা মৌখিকভাবে জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই বিশ্বাসেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। পরে এক পাশের জমির সমস্যা সমাধান হলেও অন্য পাশের জমি পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, কিছু স্থাপনার আংশিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে হলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিকল্প উপায় খুঁজছি, যাতে সেতুটি দ্রুত ব্যবহার উপযোগী করা যায়।