ধ্বংসের পথে কালের সাক্ষী আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল

ময়মনসিংহে ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল এখন ধ্বংসের পথে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে ভিত স্থাপন করেছে পর্যটন খাত। ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে টেনেছে পর্যটক। এসব দেখার জন্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে যায় দর্শনার্থীরা। শক্তিশালী হয়েছে দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থান, সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্র একেবারে ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক স্থাপনা পড়ে আছে অবহেলা ও অযত্নে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে এগুলো। কোথায় আবার এগুলোর অস্তিত্ব বিলীন। ফলে বিকশিত হতে পারেনি পর্যটন শিল্প। দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। কমছে বিদেশি বিনিয়োগ। আবার দেশের মানুষ আকর্ষণীয় স্থান দেখার জন্য ছুটে যাচ্ছে অনেক দেশে। যেখানে নিজের দেশের অনেক স্থান রয়ে গেছে অচেনা।

তেমনি অনেক নিদর্শন আছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়। জমিদার আমলে এ অঞ্চলে প্রভাব থাকায় গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন স্থাপনা। তার মধ্যে অন্যতম নিদর্শন আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল। এখানে এসেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকই—যা বর্তমানে পড়ে আছে করুণ অবস্থায়। ধসে পড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। অথচ এই আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল হয়ে উঠতে পারত পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম জায়গা। কিন্তু এদিকে নজর নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

বিদেশি অতিথিদের থাকার জন্য ১৮৭৯ সালে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী নির্মাণ করেন আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল। সেই সময়কার ৪৫ হাজার টাকায় নির্মিত এই লোহার কুঠিতে ব্যবহার করা হয় বার্মা থেকে আনা সেগুন কাঠ, লোহা ও ইস্পাত। ১৪টি কক্ষ নিয়ে এখনো কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় এই অতিথিশালা। এই লোহার কুঠি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যা ভূমিকম্প প্রতিরোধক। গরমে ঠান্ডা এবং ঠান্ডায় গরম থাকত প্রতিটি কক্ষ। শৈল্পিক কারুকাজে সজ্জিত ভবনটি ছিল একসময় আকর্ষণীয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ তা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। এই আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলে অতিথি হিসেবে এসেছেন অনেক গুণী জন।

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী থাকেন এই লোহার কুঠিতে। এছাড়া, লর্ড কার্জন, চিত্তরঞ্জন দাস, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুও ছিলেন এখানে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না এই আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের ইতিহাস। সংস্কারের অভাবে স্থাপনাটি আজ পড়ে আছে দুরবস্থায়। খসে পড়ছে পলেস্তারা, চুরি হয়ে যাচ্ছে লোহার তৈরি বিভিন্ন অংশ। বিভিন্ন জায়গায় দেখা দিয়েছে ফাটল। শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলটি ধসে পড়তে পারে যে কোনো সময়।

আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল দেখতে আসা পর্যটক বিনয় হোসাইন জানান, এই ক্যাসেলটি ময়মনসিংহের ঐতিহ্য বহন করছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু আমরা এই স্থাপনাটি ধ্বংস করে ফেলছি। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিরা এসেছেন। পরিচিত করিয়েছেন ময়মনসিংহ জেলাকে। কিন্তু আজ এটি অবহেলিত।

নগরীর বাসিন্দা সাংবাদিক কামরুজ্জামান মিন্টু জানান, ময়মনসিংহে বিভিন্ন জায়গায় জমিদার আমলের স্থাপনা রয়েছে। কিন্তু আজ তা অবহেলায়। এগুলো সংরক্ষণ করা হলে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করত। তখন দেশ বিদেশ থেকে পর্যটকরা আসত। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতো, বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো।

স্কুল শিক্ষার্থী ইয়ার মাহামুদ বলেন, আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল সম্পর্কে এখানে কোনো বোর্ড নাই। এটি কবে, কে, কখন তৈরি করেছে আমরা কিছুই জানি না। যদি লিখত, কোন বোর্ড থাকত; তাহলে আমরা সহজেই তা জানতে পারতাম। বাইরে থেকে যারা আসত তারাও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারত।

আসমা তাবাসসুম নামে এক অভিভাবক জানান, আমার ছেলে আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের পাশেই এক স্কুলে পড়াশোনা করে। আমরা অভিভাবকেরা এই ক্যাসেলের নিচে বসে অপেক্ষা করি। অনেক সময় ভেতরে লোহা ভেঙে পড়ার শব্দ পাই। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে। এতে আমরা সব সময় আতঙ্কিত থাকি।

সংস্কৃতিকর্মী ও পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন জানান, এটা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জার, যে আমরা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছি না। শুধু স্থাপনা ধসে পড়ছে না, ধসে পড়ছে আমাদের ইতিহাস। এর জন্য দায়ী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। চোখের সামনে এত কিছু হওয়ার পরও উনারা চোখে কাঠের চশমা পরে ঘুরছেন। আমরা নাগরিক সমাজ এসব স্থাপনের সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছি দীর্ঘ দিন ধরে। কিন্তু কে শুনে কার কথা। সবাই অপেক্ষা করছে কখন এগুলো ধ্বংস হবে, আর জমিগুলো দখল করে বড় বড় ভবন তুলবে। আমরা আগেও এমন হতে দেখেছি। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলতে চাই ইতিহাস ধ্বংস হবার আগেই ইতিহাস সংরক্ষণ করুন। নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে না। তখন এই প্রজন্ম আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না।

এদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গার ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেই প্রকল্পের মাধ্যমে আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেই আলোকেই শুরু হবে সংস্কার কাজ। ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক ১৪৭ বছরের পুরাতন ভবনটি সংস্কার করে স্থানটিকে গড়ে তোলা হবে পর্যটনকেন্দ্রে—এমনটাই প্রত্যাশা ময়মনসিংহবাসীর।