শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সূতিকাগার হয়, তাহা হইলে সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের চাইতে বড় আর কী হইতে পারে? অথচ আমাদের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আচরণ দেখিলে মনে হয়, শিক্ষার্থীর জীবন, স্বপ্ন, সম্ভাবনা কিছুই বড় নহে। বড় হইয়া উঠিয়াছে তাহাদের প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের পরিসংখ্যান, জিপিএ-৫-এর সংখ্যা এবং শতভাগ পাশের সুনাম! সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হইয়াছিল প্রায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার শিক্ষার্থী; কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করিয়াছে প্রায় ১৪ লাখ ৪৮ হাজার। মাঝখানে হারাইয়া গিয়াছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী। এত বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরী কি হঠাৎ করিয়া শিক্ষাজীবন ত্যাগ করিল? সকলেই কি অকৃতকার্য হইয়াছিল? প্রতিবেদন বলিতেছে, তাহা নহে। অনেক শিক্ষার্থী নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াও মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায় নাই। কোথাও কোথাও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ না পাওয়াই হইয়াছে তাহাদের অপরাধ। কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ লইয়া এইভাবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি ছিনিমিনি খেলিতে পারে?
এই প্রবণতা শুধু বেআইনি নহে, ইহা শিক্ষার ধারণার প্রতিই এক ধরনের নির্মম উপহাস। একটি বিদ্যালয় তাহার দুর্বল শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করিবে, তাহাকে উন্নত করিবে, পরীক্ষার উপযোগী করিবে-ইহাই তাহাদের দায়িত্ব। তাহার পরিবর্তে দুর্বল ফলের শিক্ষার্থীকে সরাইয়া দিয়া বিদ্যালয় নিজের ফলাফল উজ্জ্বল করিবে ইহা অতীব ভয়ংকর। ভয়ংকর এই কারণে যে, এই কৌশলকেই 'শতভাগ সাফল্য' বলিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়। শতভাগ পাশ, বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫, নামকরা কলেজে ভর্তি, সকল মিলাইয়া একটি প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য তৈরি হয়। অভিভাবক সেই পরিসংখ্যান দেখিয়া সন্তান ভর্তি করান। ফলে শিক্ষার্থীও ধীরে ধীরে মানুষ হিসাবে নহে, একটি ফলাফলের সংখ্যা হিসাবে বিবেচিত হইতে থাকে।
এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান লওয়া জরুরি। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাহার সাফল্যের হিসাব প্রকাশ করিলে শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দেখাইলে চলিবে না। নবম শ্রেণিতে কতজন নিবন্ধিত হইয়াছিল, এসএসসিতে কতজন ফরম পূরণ করিয়াছে, কতজন পরীক্ষায় অংশ লইয়াছে, কতজন উত্তীর্ণ হইয়াছে, কতজন জিপিএ-৫ পাইয়াছে-এই সম্পূর্ণ চিত্র প্রকাশ করিতে হইবে। তাহা না হইলে শতভাগ পাশের দাবি অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর থাকিয়া যায়। বিশেষত নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠোরভাবে দেখা দরকার। কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম যত বড়ই হউক, তাহার কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পাবলিক পরীক্ষার বাইরে রাখার অধিকার তাহার নাই। অভিযোগ সত্য হইলে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনিতে হইবে। কেবল কারণ দর্শানোর নোটিশ যথেষ্ট নহে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হইলে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে।
শিক্ষা বোর্ডগুলির হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ আসিয়াছে। নবম শ্রেণির নিবন্ধন ও এসএসসি ফরম পূরণের তথ্য ডিজিটালভাবে সংযুক্ত করিয়া প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ঝরে পড়ার হার প্রকাশ করা যাইতে পারে। অস্বাভাবিক ব্যবধান দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরীক্ষা শুরু হইতে পারে। টেস্ট পরীক্ষায় কে কত পাইয়াছে, কে ফরম পূরণ করিয়াছে, কে করে নাই, তাহার পূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করিতে হইবে। শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসিবার সুযোগ দেওয়া হইয়াছে কি না, তাহাও নজরদারির আওতায় আনিতে হইবে। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা করিবার জন্য একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বলি দেওয়া কোনো সাফল্য নহে। বরং ইহা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। যে বিদ্যালয় দুর্বল শিক্ষার্থীকে সরাইয়া নিজের ফলাফল সুন্দর রাখে, তাহার শতভাগ পাশের সার্টিফিকেট যতই চকচকে হউক, শিক্ষার কাছে তাহার মূল্য কতটুকু? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম শিক্ষার্থীর জীবন দিয়াই নির্মিত হয়। সেই সুনাম রক্ষার জন্য শিক্ষার্থীর জীবনকেই যদি বিসর্জন দিতে হয়, তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিবে-কাহাদের জন্য এই সুনাম?