চীনের মিসাইলের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র!

কয়েক হাজার মাইল দূরের মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁত ও দ্রুতগতিতে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে চীন। বেইজিংয়ের নতুন এই সামরিক সক্ষমতার ফলে দূরবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং উচ্চমূল্যের আকাশযানগুলো সরাসরি চীনের আওতাভুক্ত হয়ে পড়েছে বলে মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়, চীন এমন একধরনের হাইপারসনিক গ্লাইড প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যা হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থানরত উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট, মাঝআকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার বিমান এবং প্রাথমিক সতর্কতাদায়ক ‘আওয়াকস’ যুদ্ধবিমানের ওপর আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে টানা ছয় মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও দূরপাল্লার অস্ত্রের মজুত সংকটে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে চীনের এই অস্ত্রাগার সমৃদ্ধির তথ্য সামনে এল।

চীনা সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে নিজেদের হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে আকাশ থেকে আকাশে হামলার ক্ষমতা এবং জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতা যুক্ত করেছে। এর মধ্যে শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুতগতির ‘ডিএফ-১৭’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। প্রায় ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুয়াম। এ ছাড়া বেইজিংয়ের আধুনিক ‘ডিএফ-২৭’ ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার, যা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি থাকা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছাতে সক্ষম। বায়ুমণ্ডলে আঁকাবাঁকা গতিপথ ও চরম গতির কারণে বর্তমানের কোনো উন্নত মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষেই এগুলোকে মাঝআকাশে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।

তবে দূরবর্তী কোনো চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কৌশলগত ঝুঁকিও রয়েছে। ৮ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগে, যা শত্রুর অবস্থান অনবরত নজরদারিতে রাখা এবং সংকেত আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বেশ জটিল। এ ছাড়া এই প্রযুক্তির অন্যতম বড় সংকট হলো—প্রচলিত কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণকে শত্রুদেশ ভুলবশত পারমাণবিক হামলা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, যা তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক যুদ্ধ ডেকে আনার ঝুঁকি তৈরি করে। এই জটিলতা সত্ত্বেও চীন নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।

মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউট’-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, চীনের সমরতত্ত্বে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন কেবল নির্দিষ্ট কোনো ভবন বা ঘাঁটিতে আঘাত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং শত্রুপক্ষের যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্রীয় অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রাডার নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি অচল করে দেওয়াই বেইজিংয়ের মূল কৌশল।

পেন্টাগনের সাম্প্রতিক হিসাবের বরাতে জানা যায়, ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালেই চীনের অস্ত্র উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ত্বরান্বিত হয়েছে। বেইজিংয়ের বহরে বর্তমানে অন্তত ৩ হাজার ১৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩০০টি ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় যথাক্রমে ১৪৭ ও ৫০ শতাংশ বেশি। এই বিপুল সামরিক অগ্রগতি দূর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক একচ্ছত্রতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে ক্ষমতার ভারসাম্য চীনের পক্ষে টেনে নিচ্ছে।