কুড়িগ্রাম

৮ বছরের অপেক্ষার অবসান, কাল উদ্বোধন হচ্ছে রত্নাই সেতু

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট এলাকায় রত্নাই নদীর ওপর নির্মিত বহুল প্রত্যাশিত রত্নাই সেতু। শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেল ৩টায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু সেতুটির উদ্বোধন করবেন।

সেতুটিকে ঘিরে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে আনন্দ ও প্রত্যাশা। তাদের আশা, রত্নাই সেতু চালু হলে দুই জেলার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাট সদর এলাকার লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে। একই সঙ্গে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে গতি আসবে।

রত্নাই সেতুর অভাবে এতদিন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী-ধরলা সেতুরও পূর্ণ সুফল পাচ্ছিলেন না দুই জেলার মানুষ। ২০১৮ সালের ৩ জুন ফুলবাড়ী-ধরলা সেতু উদ্বোধন হলেও লালমনিরহাট অংশে রত্নাই নদীর ওপর থাকা জরাজীর্ণ বেইলি সেতু বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারায় বিকল্প পথে দীর্ঘ ঘুরে যেতে হতো।

ফলে ধরলা সেতু চালু হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন রত্নাই সেতু চালু হলে সেই দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে অনেককে নাগেশ্বরী হয়ে ঘুরে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে হয়। নতুন সেতু চালু হলে এই অতিরিক্ত পথের বড় অংশই কমে আসবে।

ফুলবাড়ী সদরের মেসার্স হক ট্রেডার্সের মালিক এমদাদুল হক বলেন, ‘ফুলবাড়ী-ধরলা সেতু উদ্বোধনের পরও রত্নাই সেতুর অভাবে আমরা এর পূর্ণ সুফল পাইনি। অবশেষে দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। সেতুটি চালু হলে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার পথ কমে আসবে। এতে পণ্য পরিবহন খরচও অনেকটা কমবে।’

ফুলবাড়ীর ব্যবসায়ী ওয়াহেদ আলী, বালারহাট বাজারের ব্যবসায়ী আবু তালেব ও আবুল কাসেম বলেন, এখন নাগেশ্বরী হয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ঘুরে মালামাল আনতে হয়। রত্নাই সেতু চালু হলে এই অতিরিক্ত পথ আর পাড়ি দিতে হবে না। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয়—দুটিই সাশ্রয় হবে।

শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, নতুন সেতুটি শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও স্বস্তি আনবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফুলবাড়ীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী স্মৃতি রায় ও শ্রাবন্তি মণ্ডল বলেন, বাড়ি থেকে রাজশাহী যেতে নানা ভোগান্তির কারণে তাদের রংপুর গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। রত্নাই সেতু চালু হলে ফুলবাড়ী থেকে সরাসরি রাজশাহীর দিকে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন সেতুর মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে এ এলাকার যোগাযোগ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য কম সময়ে ও কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে রত্নাই সেতু। এর দৈর্ঘ্য ১৩০ মিটার এবং প্রস্থ ১০ দশমিক ৫ মিটার। ‘প্রজেন্ট ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড কংক্রিট অ্যান্ড স্টিল টেকনোলজি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে।

২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বর সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়ক, রং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ এস. এম. রিয়াজ মোর্শেদ বলেন, জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে বর্তমানে দ্রুতগতিতে কাজ শেষ করা হয়েছে। কোরবানির ঈদের চার দিন আগেই সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজও শেষ হয়েছে। সড়কের দুই পাশে গাইডওয়াল বিভিন্ন রঙে সাজানো হয়েছে।

তিনি জানান, উদ্বোধনের পর মূল সেতুর রেলিংয়ের কিছু কাজ সম্পন্ন করা হবে।

লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দেবাশীষ সাহা বলেন, সেতুর মূল কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে সংযোগ সড়ক ও রঙের কিছু কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটির উদ্বোধন হবে।

রত্নাই সেতু চালু হলে শুধু একটি নদীর ওপর যোগাযোগের নতুন পথই তৈরি হবে না; দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন ও ঘুরপথে চলা দুই জেলার মানুষের জন্য খুলবে সরাসরি যোগাযোগের নতুন দুয়ার। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এর মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন গতি।