প্রতি বছর ফিরে আসে পাখিরা, অপেক্ষায় থাকে পুরো গ্রাম

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১৬

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। চারপাশে মৃদু কুয়াশার আবেশ। এর মধ্যেই গাছের ডালে ডালে শুরু হয় পাখিদের কিচিরমিচির। কোথাও মা পাখি ছানার মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার, কোথাও আবার ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে পানকৌড়ি। সঙ্গে বক, শামুকখোল, রাতচরা ও ঘুঘুসহ নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।

এ দৃশ্য এখন নাজিরপাড়ার মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। বরং পাখিদের আগমনের অপেক্ষায় থাকেন গ্রামের বাসিন্দারা। কারণ প্রায় এক যুগ ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শত শত দেশি-বিদেশি পাখির নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাজিরপাড়া।

গাছের ডাল আর বাঁশঝাড়জুড়ে পাখিদের বাসা। কোথাও ডিমে তা দিচ্ছে মা পাখি, কোথাও ছানাদের নিয়ে ব্যস্ত তারা। আর নিচে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন গ্রামের মানুষ। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারাও যেন নীরব প্রহরী।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর জুন-জুলাই মাসে নাজিরপাড়ায় আসতে শুরু করে এসব পাখি। গাছের ডালে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে এবং ছানা ফোটায়। বংশবিস্তার শেষে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস অবস্থান করে নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে তারা আবার নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে যায়।

বছরের পর বছর একই নিয়মে পাখিদের এই আসা-যাওয়া চলছে। নিরাপদ পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ায় পাখিগুলোও যেন নাজিরপাড়াকে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছে।

শীতের আগে পাখিরা যখন গ্রামে আসতে শুরু করে, তখন বদলে যায় নাজিরপাড়ার চিত্র। সকাল-সন্ধ্যা পাখিদের ডানা ঝাপটানো আর কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকে চারপাশ। প্রকৃতির এই অনন্য দৃশ্য দেখতে এখন দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। অনেকে পাখিদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।

পাখিদের এই নিরাপদ আবাস ধরে রাখতে গ্রামের মানুষের ভূমিকাও কম নয়। বাইরে থেকে কেউ পাখি শিকার করতে এলে তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা মিলে তাদের বাধা দেন। পাখিদের কেউ যেন বিরক্ত বা শিকার করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকেন তারা।

নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম টিন্টু বলেন, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর এসব পাখি এখানে আসে। বাইরে থেকে অনেকেই পাখি শিকার করতে এলেও গ্রামের তরুণ ও অভিভাবকেরা মিলে তা প্রতিহত করেন।

তিনি বলেন, ‘সকালে পাখির ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে। পাখিগুলো এখন আমাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছে।’

তবে পাখির এমন অবাধ বিচরণে কিছুটা ভোগান্তিও পোহাতে হয় গ্রামবাসীকে। শহিদুল ইসলাম বলেন, পাখির মলমূত্রে রাস্তা ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হয়ে যায়। দুর্গন্ধও ছড়ায়। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হলে এই সমস্যা কমবে।

নাজিরপাড়ার বাসিন্দা হাবিবুল আলম বলেন, পাখির কারণেই নাজিরপাড়া এখন আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের কলকাকলিতে পুরো গ্রাম মুখরিত থাকে। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন।

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষও পাখিদের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিয়মিত খাবার দেন। তবে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর কারণে পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকেও প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বোদা পারাজ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রওশন আরা বেগম বলেন, শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশে আসে। খাবারের সহজলভ্যতা, বংশবৃদ্ধির সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশের কারণে কোনো কোনো এলাকায় তারা প্রতিবছর ফিরে আসে। বংশবিস্তার শেষে উপযুক্ত আবহাওয়া ফিরে এলে তারা আবার নিজেদের আবাসস্থলে চলে যায়।

তিনি জানান, এসব পাখি শামুক, ছোট মাছ ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় খেয়ে জীবন ধারণ করে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।  

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি এখানে এসে বাসা বাঁধে ও বংশবিস্তার করে।

তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সচেতন করা হয়েছে। স্থানীয়রাও পাখিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিক। কেউ যাতে পাখিদের বিরক্ত না করে, সে বিষয়ে বাইরের দর্শনার্থী ও পর্যটকদেরও সচেতন করা হচ্ছে।

পাখিরা যে গাছগুলোতে বাসা বাঁধে, সেসব গাছ সংরক্ষণের জন্যও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ করা হয়েছে।

নাজিরপাড়ার গাছপালা আর পাখিদের এই সহাবস্থান যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নীরব চুক্তি। পাখিরা আসে, সংসার গড়ে, ছানা বড় করে আবার ফিরে যায়। আর তাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকে পুরো গ্রাম। এভাবেই বছরের পর বছর নাজিরপাড়া হয়ে উঠেছে পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা—যেখানে অতিথি হয়ে আসা পাখিরাও ধীরে ধীরে পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে।

 
ইত্তেফাক/এমএএম