এশিয়ার নোবেলখ্যাত ৬৮তম র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ পেয়েছেন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ-এর প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত, সামগ্রিক ও স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক উন্নয়ন সমাধান গড়ে তোলায় তার নেতৃত্ব, সাহস ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ সম্মাননা পাচ্ছেন।
র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ডকে এশিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি বহুলভাবে ‘এশিয়ার নোবেল’ নামে পরিচিত। ‘Greatness of Spirit’ বা মানবিক মহত্ত্ব এবং এশিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের স্বীকৃতিতে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের স্মরণে ১৯৫৮ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলাতে র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন (আরএমএএফ)-এর চেয়ারম্যান এডগার ও. চুয়া এবং প্রেসিডেন্ট সুসানা বি. আফান ৬৮তম এই অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রুনা খান বলেন, “গভীর আনন্দ ও বিনয়ের সঙ্গে আমি র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করছি। কোনো নেতা একা পথ চলেন না। তাই এই স্বীকৃতি আমি সেইসব প্রান্তিক কমিউনিটির পক্ষ থেকে গ্রহণ করছি, যারা আমাদের তাদের পাশে থেকে চলার সুযোগ দিয়েছেন, এবং আমার ফ্রেন্ডশিপ পরিবারের পক্ষ থেকে, যাদের নিরলস নিষ্ঠা প্রতিদিন এই কাজকে সম্ভব করে তোলে। যারা গত ২৫ বছর ধরে প্রায় অসম্ভব এই পথচলায় আমাদের বিশ্বাস করেছেন এবং পাশে থেকেছেন, তাদের প্রতিও আমি গভীর কৃতজ্ঞ। এই স্বীকৃতি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব।”
রুনা খান বাংলাদেশ থেকে এ পুরস্কার পাওয়া ১৪তম ব্যক্তি। এর আগে বাংলাদেশ থেকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্যার ফজলে হাসান আবেদসহ আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই সম্মাননা পেয়েছেন। আগামী ১৫ নভেম্বর ফিলিপাইনের ম্যানিলায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার প্রদান করা হবে।
রুনা খানের কাজের শুরু বাংলাদেশের দুর্গম নদীবেষ্টিত অঞ্চল থেকে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, বাস্তবতা ও প্রয়োজনকে গভীরভাবে বুঝে তাদের জন্য উপযোগী সমাধান তৈরির লক্ষ্যেই তিনি ২০০২ সালে ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে যাত্রা শুরু করা ফ্রেন্ডশিপ বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু কার্যক্রম, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকত্ব এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে কাজ করছে। সংস্থাটি বর্তমানে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষকে সেবা প্রদান করে।
ফ্রেন্ডশিপের উন্নয়ন দর্শনের মূল কথা হলো—মানুষকে এমন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বাধ্য করা নয়, যে ব্যবস্থা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না; বরং মানুষের বাস্তবতা, সক্ষমতা ও প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ কারণে স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষিত করা, কমিউনিটিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, অধিকার ও জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা ফ্রেন্ডশিপের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠার পর রুনা খান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তার উদ্যোগে ২০০৬ সালে লুক্সেমবার্গ, ২০০৭ সালে নেদারল্যান্ডস, ২০১০ সালে যুক্তরাজ্য, ২০১৫ সালে ফ্রান্স এবং ২০১৮ সালে বেলজিয়ামে ফ্রেন্ডশিপের আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দাতা ও অংশীদারদের সঙ্গে সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে স্থানীয় মালিকানা ও নেতৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশ থেকে মোট ১৩ জন এই পুরস্কার পেয়েছেন। তারা হলেন—সমাজসেবী তহরুন্নেসা আবদুল্লাহ (১৯৭৮), ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ (১৯৮০), গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস (১৯৮৪), গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী (১৯৮৫), ক্যাথলিক ধর্মযাজক রিচার্ড উইলিয়াম টিম (১৯৮৭), দিদার কমপ্রিহেন্সিভ ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইয়াসিন (১৯৮৮), বেসরকারি সংগঠন বাঁচতে শেখার প্রতিষ্ঠাতা অ্যাঞ্জেলা গোমেজ (১৯৯৯), বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ (২০০৪), প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান (২০০৫), বেসরকারি সংগঠন সিডিডির নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম নোমান (২০১০), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (২০১২), বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী (২০২১) এবং জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ (২০২৩)।